default-image

মহান মুক্তিযুদ্ধকালে যশোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন অনেকে। তাঁদের মধ্যে ২৮ জনকে গণকবর দেওয়া হয় দুটি স্থানে। এই দুটি গণকবর আজও সরকারিভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। একটি জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। সেখানে উঠেছে ব্যক্তিমালিকানার স্থাপনা।

গণকবর দুটির মধ্যে একটি রয়েছে যশোর সদর উপজেলার নীলগঞ্জ মহাশ্মশান এলাকায় ভৈরব নদের তীরে। অপরটি আছে যশোর পৌরসভাভুক্ত উপশহর এলাকার খালপাড়ে।

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর দেশের প্রথম জেলা হিসেবে শত্রুমুক্ত হয় যশোর। জেলায় ৩৬টি নির্যাতন কেন্দ্র, ৩৩টি গণকবর ও ৩৯টি বধ্যভূমি শনাক্ত হয়েছে। একাত্তরে যশোরে গণহত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৫৮৯ জন। শংকর কুমার মল্লিকের গণহত্যা বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: যশোর জেলা, আসাদুজ্জামান আসাদের মুক্তিযুদ্ধে যশোর ও রুকুনউদ্দৌলার মুক্তিযুদ্ধে যশোর শীর্ষক গ্রন্থে এসব তথ্য রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে নীলগঞ্জ মহাশশ্মান ও উপশহর খালপাড়ের গণকবর–সম্পর্কিত কোনো তথ্য–উপাত্ত কোনো বইয়ে নেই। তবে উপশহর খালপাড়ের গণকবর বিষয়ে গবেষণা করছেন যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক পারভীনা খাতুন। তিনি চলতি বছরের শুরুর দিকে যশোর শিক্ষা বোর্ডে গণহত্যা গবেষণাবিষয়ক একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন। খুলনা গণহত্যা–নির্যাতন, আর্কাইভ ও জাদুঘরের আয়োজনে ওই প্রশিক্ষণ হয়। পরে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের গণহত্যা নিয়ে গবেষণার বিষয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পারভীনা খাতুন বলেন, ‘যশোরের উপশহর ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১০টি গণহত্যা কেন্দ্র ছিল। মানুষকে ধরে এনে এখানে হত্যা করা হতো। পরে লাশ উপশহর খালপাড়সহ চারটি স্থানে ফেলা হতো। খালপাড়ের গণকবরেই ১৯–২০ জনের লাশ পাওয়া যায়। উপশহরে আরও তিনটি গণকবর রয়েছে। সব মিলিয়ে ওই এলাকায় মোট ৪৬ জন শহীদ হন। তাঁদের নাম-ঠিকানা আমার সংগ্রহে রয়েছে।’নীলগঞ্জ এলাকার গণকবরের বিষয়ে জানতে চাইলে পারভীনা খাতুন বলেন, নীলগঞ্জ এলাকায় নয়জনকে গণকবর দেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। ওই গণকবর নিয়ে গবেষণা হবে। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল এলাকার নয়জনকে ধরে এনে নীলগঞ্জ মহাশ্মশান এলাকায় হত্যা করে হানাদারেরা। পরে পাশের ভৈরব নদের তীরের একটি স্থানে কবর খুঁড়ে লাশগুলো মাটি চাপা দেওয়া হয়।

সেদিন কবর খোঁড়ার জন্য পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল নীলগঞ্জ সাহাপাড়া এলাকার কয়েকজনকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুই ভাই আলিম উদ্দীন ও আমিন উদ্দীন। আলিম উদ্দীন বলেন, ‘দুই পাকিস্তানি সেনা আমাদের বাড়িতে যায়। আমাদের কোদাল নিয়ে তাদের সাথে যেতে বলে। আমি আর আমার ছোট ভাই আমিন তাদের সাথে যাই। গিয়ে দেখি, ভৈরব নদের তীরে নয়জনের ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে আছে। তাঁদের মধ্যে নীলগঞ্জ এলাকার মোয়াজ্জেম হোসেন বিশ্বাসকে শুধু চিনতে পারি। তাঁর কানের নিচে গুলির জখম ছিল। অপর একজনের কোমরে গুলি লাগে। তখনো বেঁচে ছিলেন। জীবিত অবস্থায় তাঁকেও একই কবরে মাটি চাপা দিতে বাধ্য করে পাকিস্তানিরা।’

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই স্থানে ভৈরব নদের তীরে গণকবরের কোনো চিহ্ন নেই। জায়গাটি ভৈরব নদের হলে এখন বেদখলে রয়েছে। সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

শহীদ মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আব্বাকে গণকবর দেওয়ার কথা শুনে পরে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। গণকবরের পাশে আব্বার পকেট নোটবুক আর পাঞ্জাবি পেয়েছিলাম। আমি সরকারিভাবে গণকবরটি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।’

একই অবস্থা যশোর পৌরসভাভুক্ত উপশহর এলাকার খালপাড়ের গণকবরের। একাত্তরের ৪ এপ্রিল ১৯ জনকে ধরে এনে এই স্থানে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। লাশগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অবস্থা সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় স্থানীয় কয়েকজন মিলে লাশগুলো পাশের খালপাড়ের একটি স্থানে গণকবর দেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, উপশহর খালপাড়ে গণকবর সংশ্লিষ্ট কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। সেখানে গণকবরের অস্তিত্ব বোঝারই কোনো উপায় নেই। খালের পাড়ের জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে।

যাঁরা স্বেচ্ছাসেবায় গণকবর দিয়েছিলেন, তাঁদের একজন স্থানীয় বাসিন্দা আজিম উদ্দীন আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন জায়গা থেকে এক দিনেই ১৯ জনকে ধরে উপশহর খালপাড়ে এনে হত্যা করে। লাশগুলো পচে যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়, সে জন্য আমরা কয়েকজন মিলে গণকবর দিই। বিভিন্ন সময় আরও কয়েকজনকে সেখানে হত্যা করে হানাদারেরা। গণকবরটি সংরক্ষণ করা দরকার।’

বিজ্ঞাপন

অনাবিষ্কৃত গণকবর দুটি সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘নীলগঞ্জ ও উপশহর এলাকার গণকবর দুটির বিষয়ে আমাদের জানা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে আনা হবে। এরপর গণকবর দুটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যশোরে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বেশির ভাগ বধ্যভূমি ও গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। জেলায় সর্বশেষ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে যশোর শহরের প্রবেশমুখ মুড়ুলী মোড়ে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী জেলা শহর অবরুদ্ধ করে। ওই দিন বেনাপোল সীমান্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল তিনটি খোলা জিপ নিয়ে যশোর-চুকনগর মহাসড়ক ধরে মুড়ুলী মোড়ে আসে। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত গুলি চালায়। গাড়ি থেকে নেমে ভৈরব নদ সাঁতরে অন্যরা জীবন বাঁচালেও ঘটনাস্থলেই শহীদ হন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মুড়ুলী মোড়ের গণহত্যা নিয়েও কোনো বইয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে এই গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন যশোর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোফাজ্জেল হোসেন। তিনি ইতিমধ্যে সেদিনের ঘটনার বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীকে শনাক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুড়ুলী এলাকার ভ্যানচালক আক্কেল আলী খাঁ ও মোড়ের চা–দোকানি (এখন মুদিদোকানি) আবদুর রাজ্জাক।

সেদিন ওই জিপ গাড়িতে ছিলেন রবিউল আলমও। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে যশোর অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) উপপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘একজন পথচারী আমাদের ওদিকে যেতে নিষেধ করেছিল। তারপরও আমরা গেলাম। মুড়ুলী মোড়ে পৌঁছে দেখলাম, সড়কদ্বীপে পাকিস্তানি বাহিনী এলএমজি অস্ত্র তাক করে রেখেছে। জিপে থাকা গাজী আবদুল হাই “জয় বাংলা” স্লোগান দিল। সাথে সাথে বৃষ্টির মতো গুলি আসতে লাগল আমাদের দিকে। গুলিতে গাড়ির সামনের কাচ ও দরজা ঝাঁঝরা হয়ে গেল। আমার কাছে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছিল। আমি কয়েকটি গুলি ছুড়লাম। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ কমে আসে। তখন আমরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচাই। আমাদের সঙ্গে থাকা ওমর ফারুক ও নিখিল রায় ঘটনাস্থলেই শহীদ হন।’

মুড়ুলী মোড়ে শহীদদের স্মরণে পাঁচ শতক জমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)।

যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা মো. ইফতেখার আলী বলেন, ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন।