default-image

আতাহার আলীর বয়স তখন ২০। এক বিকেলে মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছাড়লেন। চাকরি নিলেন পুলিশে। শেষ কর্মস্থল ছিল ময়মনসিংহ। শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। আতাহার আলী পরিবারের কাউকে না জানিয়ে যুদ্ধে গেলেন। একসময় দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আতাহার আলী আর বাড়ি ফেরেননি।

মা বেলেজান নেছা ছেলের পথ চেয়ে থাকেন। বছরখানেক পর বাড়িতে এল এক চিঠি। সেটি ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার সি আর দত্তের লেখা। বেলেজান জানতে পারেন, আতাহার আলী সিলেট অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোথায় শহীদ হয়েছেন, কোথায় তাঁর সমাধি, এসব আর জানা যায়নি। মায়ের আকুতি, অন্তত ছেলের কবর দেখে মরতে চান তিনি। সেই চেষ্টা চালিয়ে যান তাঁর অন্য সন্তানেরা। সি আর দত্তের চিঠির সূত্র ধরে কয়েক দফা তাঁরা সিলেটে আসেন। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। শেষমেষ ২০১২ সালে রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ নামের একটি বইয়ে আতাহার আলীর নাম পান তাঁরা। বইটি সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরীর লেখা। তাতে সুনামগঞ্জের ডলুরায় সমাহিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ছিল আতাহার আলীর নাম। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর পরিবার খোঁজে পায় আতাহার আলীর সমাধি। তারও দুই বছর পর আতাহার আলীর পরিবারের সদস্যরা আসেন সুনামগঞ্জে। ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদেন ৯০ বছর বয়সী মা বেলেজান নেছা।

শহীদ আতাহার আলীর বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বিরাহিমপুর (মেঘনা) গ্রামে। কৃষক মেছেরউদ্দিন বিশ্বাস ও বেলেজান নেছার সাত সন্তানের মধ্যে আতাহার আলী ছিলেন দ্বিতীয়। ডলুরায় আতাহার আলীসহ ৪৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়। তাঁদের কারও কারও বাড়ি সুনামগঞ্জে। অন্যদের বাড়ি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। তবে এই মুক্তিযোদ্ধাদের সবাই এই এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর। এখানেই অবস্থিত ডলুরা শহীদ সমাধি। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের স্থানটা জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটারের পথ। এলাকাটি যেন সবুজে মোড়া। গাছগাছালির ফাঁকে ছোট ছোট ঘরবাড়ি-দোকানপাট। এক পাশে নদীর কলতান। অন্যদিকে সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ। এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য’। পাশেই ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি তর্পণ কেন্দ্র’, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য ‘ছায়াকুঞ্জ’। এ যেন ‘ছায়া সুনিবিড় শা‌ন্তির নীড়...’। মনটা আরও নরম হয়ে যায় যখন চোখ পড়ে সারি সারি শহীদ সমাধির দিকে। প্রতিটি সমাধিতে লাগানো আছে দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করা শহীদদের নামফলক।

৪৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৬ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাঁদের এখানে দাহ করা হয়। এই ৪৮ শহীদের মধ্যে অনেকেরই পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা ছিল না। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় দেড় বছরে কাজটি সম্পন্ন করেন সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান এবং তাঁর আরেক সহযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর। এ জন্য দেশের ১২টি জেলার ২২টি উপজেলা ঘুরতে হয়েছে তাঁদের। অনেকের নাম ঠিক থাকলেও, ঠিকানা ছিল অসম্পূর্ণ। আবার কারও কারও নামও ভুল ছিল। পরিবার, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা সেটি সংশোধন করেছেন। তবে এ পর্যন্ত ৪৪ জনের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা পেলেও এখনো ৪ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। তাঁদের শুধু নাম বা জেলার নাম আছে।

এই চারজনের তথ্য সংগ্রহের কাজ অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মৃতদেহগুলো ডলুরা এলাকায় এনে রাখতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার মধু মিয়া। তাঁর বাড়ি এই ডলুরা এলাকাতেই। মধু মিয়া লেখাপড়া জানতেন না। তাঁর একটি ছোট্ট নোটবুক ছিল। যেটি এখন রয়েছে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। মধু মিয়া ওই নোটবুকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, আবার কারও কারও ঠিকানা ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের দিয়ে লিখিয়ে নিতেন। তবে অনেকেরই পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ছিল না। এভাবে মধু মিয়া ডলুরায় ৪২ জন মুসলিম মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ সমাহিত এবং ৬ জন হিন্দু মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাহ করেন। তাঁকে এই কাজে সহযোগিতা করতেন স্থানীয় কয়েকজন। মুসলিম মুক্তিযোদ্ধাদের জানাজা পড়াতেন স্থানীয় ফেনিবিল গ্রামের বাসিন্দা তারু মুনসি। আর হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের দাহ করার সময় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেন সীমান্তের ওপারের লালপানি গ্রামের বাসিন্দা নেপু ঠাকুর।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবদুল মজিদ বলেন, মধু মিয়া ছিলেন বলেই যুদ্ধের সেই দিনগুলোতে এভাবে এক জায়গায় ৪৮ জন বীর শহীদকে সমাহিত করা সম্ভব হয়েছিল। শুধু তা–ই নয়, ২০০৪ সালে ১৬ মার্চ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই শহীদ সমাধিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে এটির দেখাশোনা করছেন ফেনিবিল গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা খোকা মিয়া।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে এই গণকবরকে ঘিরে শহীদ স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়। সুনামগঞ্জ মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট এই উদ্যোগ নেয়। এটি দেখাশোনা করার জন্য প্লাটুন কমান্ডার মধু মিয়াকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। শুরুতে স্মৃতিসৌধের চারদিকে ৫ ফুট উঁচু সীমানাদেয়াল এবং ৪৮ শহীদের একটি নামফলক নির্মাণ করে দেন ৫ নম্বর সেক্টরের সেলা সাব–সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এ এস হেলাল উদ্দিন। পরবর্তী সময়ে তাঁর অর্থায়নেই এখানে দর্শনার্থীদের জন্য রেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়। ২০০৮ সালে জেলা পরিষদ ‘ছায়াকুঞ্জ’ নির্মাণ করে। ২০১১ সালে নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য ও মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ। গত বছর সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সমাধি এলাকার ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। প্রতিটি সমাধিকে নতুনভাবে পাকা করা হয়েছে। লাগানো হয়েছে পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানাসহ নতুন নামফলক। সমাধির সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। পুরো এলাকা ঘিরে ‘মুক্তিযোদ্ধা উদ্যান’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।

বিজ্ঞাপন