default-image

২৫ মার্চের কালরাত থেকেই দেশে বর্বরতা শুরু হয় হানাদার বাহিনীর। তবে পটুয়াখালী ছিল ব্যতিক্রম। ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তাঞ্চল ছিল এই জেলা। এই সময়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করে নেওয়ার সুযোগ পান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই কাজে যিনি বড় ভূমিকা রাখেন, তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এম এ আউয়াল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ লাইনস থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে এনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেন তিনি। এর জেরে পরে হানাদারেরা তাঁকে গুলিও করেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান।

জেলা প্রশাসক এম এ আউয়ালের সাহসিকতা ও পরবর্তীকালে হানাদারদের হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট ও পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে প্রকাশিত কারা ছিল রাজাকার বইয়ে উল্লেখ আছে।

তা ছাড়া পুলিশ লাইনস থেকে আনা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপরে আনসার সদস্যদের গুলিবর্ষণসহ অনেক ঘটনার তথ্য মেলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা দুটি বইয়ে। এসব ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় মুক্তিযুদ্ধে জেলা প্রশাসক এম এ আউয়ালের অবদান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

বই দুটির মধ্যে একটির লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার রক্ষিত। তাঁর বইটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিটি পড়েছেন এই প্রতিবেদক। অপর বইটির নাম মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস: পটুয়াখালী জেলা। এটির লেখক মুজাহিদুল ইসলাম প্রিন্স। বই দুটিতে পটুয়াখালীতে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার পর পটুয়াখালীর মুক্তিকামী মানুষ প্রতিরোধের শপথ নেন। এর অংশ হিসেবে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন তাঁরা। সংগ্রাম পরিষদের তত্ত্বাবধায়নে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এই প্রশিক্ষণ চলে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয় পাশেই মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ প্রথমে সরকারি কলেজ ও লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারি থেকে ক্যাডেট প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত কাঠের রাইফেল এনে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এ আউয়াল মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল ও গুলি প্রদানে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সহায়তায় জেলা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পুলিশ লাইনস থেকে ওই অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেন। ২৬ এপ্রিল হানাদার বাহিনী পটুয়াখালীতে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত সেগুলো দিয়ে অন্তত ৩০০ জনকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

২৬ এপ্রিল সকালে পটুয়াখালীতে বোমাবর্ষণ শুরু করে হানাদারদের জঙ্গি বিমান। একনাগাড়ে ৪ ঘণ্টা বোমাবর্ষণ চলে। দুপুরে চারটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ছত্রীসেনা নামানো হয় জেলা শহরের দক্ষিণে কালিকাপুর এলাকায়। নিরস্ত্র জনতার ওপর শুরু হয় নির্বিচার গণহত্যা। এক দিনেই তিন শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করে হানাদারেরা। চলে লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ। দুপুরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেই ছত্রীসেনারা প্রথমে কালিকাপুর এলাকার মাতুব্বর বাড়িতে হানা দেয়। সেদিন ওই বাড়িরই ১৯ জন শহীদ হন।

মাতুব্বর বাড়ির সদস্য নুরুল ইসলাম মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী দেখে এলাকার সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। সবাই বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত খালের পাড়ে গোলপাতা বনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু হানাদারেরা দেখে ফেলে। তাঁদের লক্ষ্য করে নির্বিচার গুলি চালায়। নিহত ব্যক্তিদের পরে বাড়ির সামনে গণকবর দেওয়া হয়েছিল।

ছত্রীসেনারা পরে যাচ্ছিলেন জেলা প্রশাসক বাসভবন এলাকা দিয়ে। এ সময় সরকারি কোয়ার্টার থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালান আনসার সদস্যরা। পাকিস্তানিরা তখন পাল্টা গুলি ছুড়লে আনসার সদস্যরা ওই ভবনের সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেন। সেনারা সেখানে গুলি করে সাত আনসার সদস্য ও তৎকালীন জেলা তথ্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আহমেদকে হত্যা করে। পরে হানাদারেরা তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এ আউয়ালের সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করে। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে। বাঁ পায়ে গুলিবিদ্ধ হন আউয়াল। তিনি জেলা প্রশাসক, এটা নিশ্চিত হলে ছত্রীসেনারা চলে যায়। পরবর্তীতে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে আর কোনো তথ্য মেলে না।

কারা ছিল রাজাকার বইয়ের তথ্য মোতাবেক, একাত্তর সালের বিভিন্ন সময়ে পটুয়াখালীতে পাকিস্তানি সেনারা দেড় সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করে। তাঁদের মধ্যে যেমন নিরস্ত্র মানুষ ছিলেন, তেমনি আছেন মুক্তিযোদ্ধারাও। জেলার অন্তত ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গণে প্রাণ হারান। শহীদদের গণকবর দেওয়া হয় বিভিন্ন স্থানে।

বিজ্ঞাপন

পটুয়াখালীতে দীর্ঘ সাড়ে সাত মাস প্রতিরোধযুদ্ধ চলে। বিভিন্ন সময়ে সম্মুখযুদ্ধ হয় পানপট্টি, মাদারবুনিয়া, কালিশুরী–চাঁদকাঠি এলাকায়। এসব যুদ্ধে কমপক্ষে ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। দিশেহারা পাকিস্তানিরা পিছু হটতে শুরু করে। খুঁজতে থাকে পালানোর পথ। ৭ ডিসেম্বর রাতে হানাদারেরা অস্ত্র, গোলাবারুদ ফেলে একটি লঞ্চে করে পটুয়াখালী ছাড়ে। ৮ ডিসেম্বর সেটি চাঁদপুরের কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে মিত্রবাহিনীর জঙ্গি বিমানের হামলায় লঞ্চটি ডুবে যায়। নিহত হয় লঞ্চে থাকা সবাই। ৮ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে পটুয়াখালী শহরে প্রবেশ করেন। তখন অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় রাজাকার ও আলবদররাও। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এতে নেতৃত্ব দেন মির্জাগঞ্জ থানা এলাকার তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলতাফ হায়দার।

স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন বাদল ব্যানার্জি। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার। প্রথম আলোকে বাদল ব্যানার্জি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আসার খবর পেয়ে সেদিন শত শত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে হানাদারমুক্ত পটুয়াখালী।