default-image

নিভৃত গ্রামের বাঁশঝাড়ের নিচে শ্বেতপাথরে (টাইলস) বাঁধাই করা একটি কবর। কবর ঘেঁষে দক্ষিণ পাশে ঈদগাহ মাঠ। তার অদূরেই হাট।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কবরে শায়িত ব্যক্তির নাম আরশাদ আলী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর নাম অনুসারেই গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে আরশাদগঞ্জ। ঈদগাহ মাঠটিও তাঁর নামেই আরশাদগঞ্জ ঈদগাহ মাঠ। হাটের নামটিও আরশাদগঞ্জ হাট। গ্রামের দুটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসারও নামকরণ করা হয়েছে এই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে।

গ্রামটি পড়েছে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে। এর আগে ওই গ্রামের নাম ছিল বাদিয়াপাড়া। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আরশাদ আলীকে কবর দেওয়ার পর গ্রামটির নামকরণ করা হয় আরশাদগঞ্জ। যদিও এই মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলায় ছিল। আরশাদের মতো আরও অনেক শহীদ শায়িত আছেন আশপাশের গ্রামের মাটিতে। এতের অনেকের নাম–পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর ভোররাতে ডিমলা উপজেলার টুনিরহাটের সম্মুখযুদ্ধে টাউড়িদহ নামক স্থানে শহীদ হন আরশাদ। এরপর সহযোদ্ধারা তাঁর লাশ ওই গ্রামে নিয়ে আসলে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যার পর সেখানে দাফন করা হয় তাঁকে।

সেই ঘটনার সাক্ষী গ্রামের মো. আব্দুল মতিন (৬৬) বলেন, ‘তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। সন্ধ্যার সময় তাঁর (আরশাদ) লাশ এই গ্রামে আনা হয়। গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সন্ধ্যার পর যখন জানাজার প্রস্তুতি চলছিল, তখন খবর এল, খান সেনারা এদিকে আসছে। তখন অনেকে পালিয়ে যান। এরপর অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।’

বিজ্ঞাপন

গ্রামের মুদি ব্যবসায়ী তারিক হোসেন (৩২) বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে আমাদের গ্রামের নামকরণ হওয়ায় গর্ব বোধ করি।’ মুক্তিযোদ্ধা আরশাদের স্বজনেরা মাঝেমধ্যে কবর জিয়ারত করতে আসেন বলে জানান তিনি।

আরশাদ আলীর সহযোদ্ধা ছিলেন নীলফামারী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সহকারী কমান্ডার আশরাফ আলী (৭০)। তিনি বলেন, ‘ওই যুদ্ধে আমিও অংশগ্রহণ করি। আরশাদ আলী ছিল আমার থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বে। ওই দিনের যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে খান সেনাদের হাতে ধরা পড়েন শামসুল হক নামের আরেক মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে তিন দিন অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর লাশ পুরাতন থানা চত্বরে পুঁতে রাখে খান সেনারা।’

আশরাফ আলী বলেন, এর আগে ১৮ অক্টোবর একই উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ব্রুজের ডাঙ্গায় শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। তাঁর বাড়ি ছিল খুলনা জেলায়। তাঁকে আরশাদগঞ্জের পাশের ঠাকুরগঞ্জ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে দাফন করা হয়। তাঁর স্বজনদের পরিচয় এখনো অজানা। বালাপাড়া ইউনিয়নের সোবহানগঞ্জ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই (৭০)। তিনি বলেন, ‘আরশাদ আলীসহ আমি একই ক্যাম্পে ছিলাম। সেদিন টুনির হাটে হিট করতে গিয়ে খান সেনাদের হাতে শহীদ হন আরশাদ আলী।’

৬ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান চৌধুরী (৬৮) বলেন, ঠাকুরগঞ্জ গ্রামটি ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এই সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে প্রবেশ করে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সম্মুখযুদ্ধ করেন। এই গ্রাম ছিল শত্রুমুক্ত। তাই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কবর দেওয়া হয়েছিল। অনেকের নাম–পরিচয় এখনো অজানা রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী, যুদ্ধও করেছেন, কিন্তু কোনো তালিকায় নাম নেই বলে দাবি করেন ঠাকুরগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মো. খোরশেদ আলী (৭০)। তিনি বলেন, এ গ্রামে আরশাদ আলীর মতো অনেক শহীদের কবর আছে। সম্প্রতি এসব কবর সংরক্ষণের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি তাঁদের নাম–পরিচয় সংরক্ষণে সরকারের প্রতি দাবি জানান।

পরে ঠাকুরগঞ্জ বাজারের মধ্যস্থলে পশ্চিম ছাতনাই কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে শ্বেতপাথরে বাঁধাই করা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর কবরটি দেখালেন খোরশেদ আলী। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার উত্তরে মধ্য ছাতনাই গ্রামে দেখালেন একটি গণকবর। এর পাশেই আরেকটি সমাধি দেখিয়ে বললেন, এই ছয় মুক্তিযোদ্ধার নাম জানা না গেলেও ওই মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল স্বপন। স্বপনের বাড়ি দিনাজপুরে ছিল বলে জানান তিনি। স্থানীয়রা বলেন, গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ আলাদাভাবে কবর দেওয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে তাঁদের সেদিন গণকবর দেওয়া হয়েছিল।

নীলফামারী–১ (ডোমার–ডিমলা) আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর বাঁধাই করার উদ্যোগ নেই। সে হিসেবে বেশ কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর ও গণকবর সংরক্ষণে কাজ শুরু করি। তবে অনেকের পরিচয় এখনো অজানা। তাঁদের নাম পরিচয় জানা প্রয়োজন।’ এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনাও আছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন