default-image

গ্রামের মাঝখান দিয়ে বুক চিতিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। দুই পাশে ছাড়া ছাড়া বাড়িঘর। সেগুলো পার হলেই বিস্তৃত হাওরভূমি। ধানখেতের চারাগাছ, করস, বরুণসহ বিভিন্ন ধরনের বুনো গাছের সবুজ পাতা রোদে চকচক করছে। ফাল্গুনের বাতাসে দুলছে। এভাবেই প্রকৃতিকে এখনো আঁকড়ে আছে নড়িয়া। নিভৃত গ্রামটি এখন যেমন শান্ত, সেদিনও তেমনই শান্ত ছিল। মাসটি ছিল বৈশাখ। তবে ঝড়ঝাপটা কিছুই ছিল না। দুপুরবেলা কেউ বাড়ি ফিরেছেন। কেউ স্নান সেরে খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউবা খেতে বসে গেছেন।

এ রকম একটা মুহূর্তে মৃত্যুছায়া গ্রামটিকে ঢেকে ফেলে। কেউ হাওরের ঝোপঝাড়, ডোবা-নালায় পালিয়ে বাঁচেন। যাঁরা পালাতে পারেননি, একেকটা লাশ হয়ে যান। মোট ২৬ জনের লাশের স্তূপ। ১৯৭১ সালে এই নড়িয়া গণহত্যা সংঘটিত হয়। বাংলা দিনপঞ্জিতে সেদিন ছিল ২৬ বৈশাখ।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা ইউনিয়নের গ্রাম নড়িয়া। শান্ত গ্রামটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। সেই নৃশংসতার স্মারক হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে ‘নড়িয়া গণহত্যা’।

বিজ্ঞাপন

গ্রামের বাসিন্দা অবিনাশ চন্দ্র দেব (৬৮) তখন কিশোর। তাঁকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার বাহিনী। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। এখন আর নড়িয়ায় থাকেন না অবিনাশ। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে রক্তরঞ্জিত বাড়িটাসহ কৃষিজমি সব বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান। তারপর ১৯৯১ সালে পাড়ি জমিয়েছেন স্পেনে। এখন সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। তবে সুযোগ পেলেই ছুটে আসেন দেশে। এলে একবারের জন্য হলেও নড়িয়ার সেই বধ্যভূমির মাটির ছোঁয়া নিয়ে যান। ২০১৫ সালে দেশে এসে অবিনাশ এই প্রতিবেদককে নড়িয়া বধ্যভূমি ঘুরিয়ে শুনিয়েছিলেন তাঁর পুনর্জন্মের কাহিনি।

অবিনাশ চন্দ্র দেব তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। সবে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। মৌলভীবাজার সদরের শেরপুর ক্যাম্প থেকে আসা একদল হানাদার বাহিনী অতর্কিত বেলা আড়াই-তিনটার দিকে গ্রামে এসে ঢোকে। তাদের সহযোগিতায় ছিল স্থানীয় কিছু দালাল। দলটি সাধুহাটি হয়ে নড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে। অবিনাশের এক কাকা শ্রীধর দেব মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। তাঁকে ধরে নিয়ে আসে। হানাদার বাহিনী দেখে বাড়ির লোকজন দক্ষিণ দিক দিয়ে যেভাবে পারেন পালানোর চেষ্টা করেন। অনেকে পাটখেতসহ ঝোপ-জঙ্গলে লুকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকে অনেককেই ধরে নিয়ে আসে হানাদাররা। ধরে আনে তাঁর দাদু কামিনী কুমার দেবকেও। বাড়ির ও আশপাশের অন্যদের সঙ্গে অবিনাশকেও ধরে আনা হয়। বাড়ির দক্ষিণ পাশে সবাইকে জড়ো করে হানাদাররা।

অবিনাশ চন্দ্র দেব বাঁচার একটু চেষ্টা হিসেবে পানি পানের কথা বলেন। কিন্তু সে সুযোগ দেয়নি হানাদাররা। পুকুরপাড়ে স্টেনগান বসানো হয়। সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো গুলি ছুড়ে পাকিস্তানি সেনারা। চোখের পলকেই সবাই কাত হয়ে পড়ে যান। অবিনাশও সেই দলের একজন। শুধু মনে আছে পরপর অনেকগুলো গুলির শব্দ। বেশ কিছু সময় লাশের স্তূপে পড়ে ছিলেন তিনি। একসময় পাশেই খড়ের গাদার আগুনের তাপ টের পান। নড়েচড়ে ওঠেন। গ্রামের একটি মেয়ে এসে ডাক দিয়ে জানতে চায়, কেউ জীবিত আছে কি না। অবিনাশ উঠে বসে পানি চান। মেয়েটি পাশের খাল থেকে পানি এনে দেয়। অবিনাশের দুই পায়েই গুলি লেগেছিল। ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল। মেয়েটি এক টুকরো কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থানটি বেঁধে দেয়। তাঁকে পাশের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন অবিনাশের পরিবারের ৭ জনসহ একই স্থানে ২৬ জন শহীদ হন। ১৯টি বসতঘর ও ৬টি গোলাঘরে আগুন লাগিয়ে লুটপাট চালানো হয়। পরে আশপাশের গ্রাম থেকে তাঁদের স্বজনেরা আসেন। ওই স্থানেই গর্ত করে মৃতদেহগুলো সমাধিস্থ করেন। বর্তমানে প্রায় এক শতক জায়গায় দেয়াল দিয়ে স্থানটিকে বধ্যভূমি হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়েছে।

অবিনাশ চন্দ্র দেব জানালেন, তিনি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থেকে হাতুড়ে হাড়ভাঙা চিকিৎসকের সেবা নেন। প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা শেষে ভালো হয়ে ওঠেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন স্থানে উন্নত চিকিৎসা করিয়েছেন। তবু ক্ষতস্থানটিতে এখনো মাঝেমধ্যে টান টান ব্যথা অনুভব করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানকার বাড়ি–জমি বিক্রি করে দিয়েছি। কিন্তু এখানে (বধ্যভূমিতে) একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য তিন শতক জায়গা রেখে যাই। বিক্রি করিনি।’

নড়িয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন মো. আনকার মিয়া। তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন তিনিও। আনকার মিয়া বলেন, ‘অনেক বড় গেরস্ত ছিল অবিনাশদের পরিবার। প্রায় দুই সপ্তাহ গোলাঘরে আগুন জ্বলেছে।’ নড়িয়া গ্রামটি খুবই শান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের বন্ধন অনেক ভালো। কারও কিছু হলে একে অন্যের বাড়িতে ছুটে যাই। একই মায়ের সন্তানের মতো আছি। এই বধ্যভূমিটাকে নিয়ে কিছু করা দরকার। দেশের জন্য মানুষগুলো জীবন দিয়েছে। সোনা দিয়ে কিছু বানিয়ে দিলেও তাঁদের ঋণ শোধ হবে না।’

বিজ্ঞাপন