১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বগুড়া স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণের আগে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান (উপরের সারিতে বা থেকে চতুর্থ)
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বগুড়া স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণের আগে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান (উপরের সারিতে বা থেকে চতুর্থ) ছবি: সংগৃহীত
default-image

নানা বাধা আর বিপত্তি পেরিয়ে ১৩ বছর বয়সী ফজলুর রহমান যখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পৌঁছালেন, তখন সবাই অবাক। সবে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠা কিশোর নিতে চান যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। কিন্তু কম বয়সী এক ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি নন ক্যাম্প কমান্ডার। এমন সিদ্ধান্তে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন ফজলুর। এ দৃশ্য দেখে ক্যাম্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মন গললে প্রশিক্ষণের সুযোগ মেলে। প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন কিশোর ফজলুর।

ফজলুর রহমানের বাড়ি জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা সদরে। জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি সবার কনিষ্ঠ বলে জানিয়েছেন সহযোদ্ধারা। তাঁর দুই বড় ভাই সাইদুর রহমান ও বজলুর রশিদ মন্টুও মুক্তিযোদ্ধা। ফজলুর রহমান উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডারের দায়িত্বেও ছিলেন।

সম্প্রতি ফজলুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে সেই সময়কার মুক্তিযোদ্ধা ছোট্ট ফজলুর রহমানের অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা-কালো ছবি দেখা গেল। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বগুড়া স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণের আগে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে তোলা সাদা-কালো গ্রুপ ছবি ঘরের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। ফজলুর রহমান তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার গল্প শোনালেন। তখন মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি তাঁর চোখে ফুটে উঠছিল।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি সবেমাত্র অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে এলাকার অনেকেই একে একে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে গেছেন। কিন্তু তিনি সঙ্গী পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ তাঁর চেয়ে বয়সে বড় নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা হয়। আলাপ-আলোচনা করে দুই দিন পর তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে প্রশিক্ষণ দিতে যাবেন বলে ঠিক করেন।

১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল। হাস্তাবসন্তপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম তখন নিচাবাজারের তাঁর দুলাভাই আফজাল হোসেনের বাড়িতে থাকতেন। সকালে ওই বাড়িতে আসেন ফজলুর। এরপর দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ছাড়েন। এর আগে নজরুল ইসলাম একটি কাগজে যুদ্ধে যাওয়ার কথা লিখে রেখে যান। রওনা হন ভারতে প্রশিক্ষণের উদ্দেশে। ফজলুরের পরনে হাফপ্যান্ট ও শার্ট। নজরুল ইসলামের পরনে লুঙ্গি-শার্ট। ফজলুর রহমানের কাছে পাকিস্তানি ২০০ রুপি ছিল। ভারতের বালুঘাট কোন দিকে সেটিও তাঁরা দুজনের কেউই জানতেন না।

সকালে নাশতা না করায় দুপুরেই দুজনের প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে। ফজলুর তখন মথুরাগ্রামের তাঁর এক আত্মীয়র বাড়িতে ওঠেন। সেখানে তাঁরা দুপুরের খাবার খেয়ে আবার হেঁটে রওনা হন। বিকেলে তাঁরা দুজন নওগাঁর ধামইরহাটের লক্ষ্মণপাড়া গ্রামের একটি বাজারে পৌঁছান। সেখানে একজন মরিচ ব্যবসায়ীর জেরার মুখে পড়েন। তখন তাঁরা দুজন মরিচ ব্যবসায়ীর কথায় কিছুটা ভয় পেয়ে যান। একপর্যায়ে তাঁরা যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলে দেন।

ফজলুর রহমান বলছিলেন, ওই ব্যবসায়ী ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য। তখন ব্যবসায়ী কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি ফজলুরদের বলেন, ‘তোমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে যাচ্ছ এ কথা কেউ জানতে পারলে দুজনকেই প্রাণে মেরে ফেলবে। তখন সন্ধ্যা-সন্ধ্যা ভাব। বরং তোমরা এখানে আমার বাড়িতে থেকে যাও। তোমরা আমার বাড়িতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের পরিচয় দেবে।’

এরপর ব্যবসায়ীর কথামতো তাঁরা পান-সুপারি আর মিষ্টি কিনে নেন। বাড়িতে যেতে যেতে ব্যবসায়ী তাঁর শ্বশুরবাড়ির গ্রামের নাম, শ্বশুর-শাশুড়ির নাম শিখিয়ে দিচ্ছিলেন। শ্বশুরের ছেলেমেয়ের সংখ্যার কথা বলে দিলেন। তাঁরা দুজন (ফজলু-নজরুল) ব্যবসায়ীর শেখানো কথা ভালো করে রপ্ত করে নিলেন। বাড়িতে গিয়ে তাঁরা ওই ব্যবসায়ীর বাবা শান্তি কমিটির সদস্যের মুখোমুখি হলেন। তবে ব্যবসায়ীর শেখানো কৌশলে তাঁরা পার পেয়ে যান।

পরদিন ৩০ এপ্রিল ভোরে খাবারদাবার শেষ করে দুজন ভারতের বালুরঘাটের কামারপাড়া সাময়িক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হন। ওই দিন সন্ধ্যার আগে তাঁরা তিনজন কামারপাড়া ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছান। ওই ব্যবসায়ী তাঁদের দুজনকে সেখানে রেখে বাড়িতে ফেরেন। তাঁরা সেই ব্যবসায়ীকে ২০ রুপি দেওয়ার জন্য জোর করছিলেন। তিনি কোনো রুপি নেননি।

এদিকে ফজলুর রহমানকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে তাঁর বাবা সামছুদ্দিন কবিরাজ ও মা জায়েদা খাতুন দুশ্চিন্তায় পড়েন। পরে আফজাল হোসেন সাখিদারের বাড়িতে এসে চিরকুটটি দেখতে পান। সেখান থেকেই ফজলুর রহমানের যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানতে পারেন।

কামারপাড়া অস্থায়ী ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন পাবনার বাসিন্দা অধ্যাপক আবু সাঈদ। ফজলুর রহমান ও নজরুল ইসলাম দুজনই কামারপাড়া সাময়িক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভর্তি হন। সেখানে তাঁরা দুজন দেড় মাস ছোটখাটো প্রশিক্ষণ নেন। এরপর তাঁরা উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিরাম প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ডাক পান। প্রতিরাম প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এক দিন থাকার পর তাঁদের শিলিগুড়ির পানিরঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে ফজলুর রহমান ও নজরুল ইসলাম গিয়ে এলাকার আজিজুল ইসলাম রাজ্জু, কাজী আবু দাউদ, অনিল সিংকে দেখতে পান। এলাকার লোকজন দেখে তাঁরা খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। তবে ফজলুর রহমানের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ক্যাম্পের কমান্ডার ফজলুর রহমানকে ছোট্ট দেখে প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি করাননি। তখন ফজলুর রহমান অঝোরে কান্নাকাটি করছিলেন। পরে সেখানকার একজন বড় কর্মকর্তা ফজলুর রহমানের কান্না দেখে তাঁকে ভর্তি করিয়ে নিতে বলেন। ফজলুর রহমানকে একটি গ্রুপে ভর্তি করান। এই গ্রুপের উইং লিডার ছিলেন পাবনার মন্টু। পরে ফজলুর সাহসিকতায় তাঁকে এ গ্রুপের সহকারী উইং লিডার করা হয়। ফজলুর রহমান দীর্ঘ এক মাসের প্রশিক্ষণে স্টেনগান, রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, মর্টার, গ্রেনেড নিক্ষেপ, বোমা ধ্বংস প্রশিক্ষণ সফলভাবে রপ্ত করেন।

বিজ্ঞাপন

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা ৭ নম্বর সেক্টরের তরঙ্গপুর হেডকোয়ার্টারে চলে আসেন। সেখান থেকে তাঁদের এসএলআর ও ১১০ রুপি দেওয়া হয়। তাঁদের পার্টি নম্বর ছিল ১০৮। তাঁরা এই দলে ছিলেন ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। ২৯ সেপ্টেম্বর কমান্ডার শরীফের নেতৃত্বে তাঁদের দলটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কালুপাড়া সীমান্ত অতিক্রম করে গভীর রাতে হরীতকীডাঙ্গা-ধামইরহাটের রাস্তায় ওঠার সময় পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ওপর অ্যামবুশ শুরু করে। এতে তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পাকিস্তানি সেনারা অটো রাইফেল দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করলে তাঁদের দলের পুলক চন্দ্র ও বেলাল হোসেন শহীদ হন।

এরপর তাঁরা সুসংগঠিত হন। তাঁরা হেঁটে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার গয়েশপুরে আসেন। সেখান থেকে তাঁরা সাগরপুর গ্রামের আছির মেম্বারের বাড়িতে আসেন। পরে ১০৬ পান্না কাজির দল ও ১০৮ নম্বর শরীফের দল একত্রে মিলে যায়। দুটি দলের মুক্তিযোদ্ধারা একত্রে মিলে বিভিন্ন অপারেশন সফল করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ও ফজলুর রহমান একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলাম। পানিঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়ে বিপত্তি দেখা দেয়। আমাকে প্রশিক্ষণে ভর্তি করিয়ে নিলেও ফজলুর রহমানের বয়স কম হওয়ায় প্রথমে তাঁকে প্রশিক্ষণে ভর্তি করে নেয়নি। তখন ফজলুর রহমান কান্নাকাটি শুরু করেন। এ দৃশ্য দেখে ক্যাম্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফজলুর রহমানকে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছিলেন।’

আক্কেলপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার নবীবুর রহমান বলেন, ‘জয়পুরহাট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা আমাদের আক্কেলপুর উপজেলায়। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান।’