default-image

প্রবেশপথে মনীষীদের বাণী। ভেতরে বিশাল প্যান্ডেলের নিচে হাজারো শিক্ষার্থী। সবার মাথায় লাল-সবুজের টুপি। প্রত্যেকের নিজ নিজ স্কুল পোশাক পরা। কিছুক্ষণ পরপর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে উল্লসিত হয়ে ওঠে তারা। শপথ নেয় একটি মানবিক সমাজ গড়ার। দুপুর পর্যন্ত তারা নাচ-গান আর আনন্দে মেতে থাকে।

এই আনন্দ মুক্তির, বিজয়ের। প্রতিবছর শিশুশিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে আয়োজিত হয় ‘মুক্তির উৎসবের’। আয়োজক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘরের শিক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এই উৎসব হয়।

বিজ্ঞাপন

উৎসবে রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা শপথ নেয় বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী-উদার-অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার। মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের চলমান বিচার-প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার। শপথ পাঠ করান ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বলে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন ও সহিংসতাকে তারা রুখে দেবে। সব ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষের অধিকার রক্ষা ও সম্প্রীতির স্বদেশ গড়বে। ধর্মের অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষ হত্যা প্রতিরোধ করবে।

এই শপথের সঙ্গে কিছু স্বপ্ন গেঁথে দেন শিক্ষাবিদ জাফর ইকবাল। তিনি শিক্ষার্থীদের নতুন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানান। যে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা নতুন এক বাংলাদেশ গড়বে। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। জাফর ইকবালের গলাব্যথা থাকায় তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী রফিকুল ইসলাম।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আয়োজকদের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুরু হয়। নৃত্যালেখ্য পরিবেশন করে স্পন্দন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে চলতে থাকে আমন্ত্রিতদের বক্তব্য। তাঁরা শোনান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের পেছনের গল্প। স্বাগত বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ২১ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।’

পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার শোনালেন তাঁর অভিযাত্রার কথা। নতুন বিজয়ের কথা। এবারের স্বাধীনতা দিবসে নিশাতের অভিযাত্রী দলটি একাত্তরের শরণার্থী ও বিপন্ন মানুষের কথা স্মরণ করে শহীদ মিনার থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে হেঁটে যাবে। শিক্ষার্থীদের তিনি এই অভিযাত্রায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

উৎসবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করে সানিডেল স্কুল, ক্যালিক্স প্রি-ক্যাডেট স্কুল, দক্ষিণখান আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, আবদুল্লাহ মেমোরিয়াল হাইস্কুল ও ইউসেপ স্কুল। শিক্ষার্থীদের গান শোনান শিল্পী ফেরদৌস আরা ও বাপ্পা মজুমদার। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি তারিক সুজাত। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তৃতীয় প্রজন্মের অংশগ্রহণে ‘বধ্যভূমির সন্তানদল’ সংগীত পরিবেশন করে। সবশেষে মঞ্চে ওঠে জলের গান।

উৎসবস্থলের এক পাশে ছিল ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেখানে ছিল একাত্তরের ছবি আর সংবাদের প্রদর্শনী। জাদুঘর ঘিরে শিক্ষার্থীদের ছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনুষ্ঠানের ফাঁকে তারা লাইন ধরে ঘুরে দেখে এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর। যেন পুরো খেলার মাঠই হয়ে ওঠে একটি জাদুঘর।

সূত্র: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৩, শনিবার, প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন