default-image

মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তকরণ কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিন গতকাল শনিবার সিলেটে যাচাই-বাছাই কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, কমিটিতে একজন মৃত ব্যক্তিকেও সদস্য করা হয়েছে।

এ ছাড়া জয়পুরহাটে বিতর্কিত একজনের আবেদনে সাফাই সাক্ষী হয়েছেন দুজন মুক্তিযোদ্ধা। আর ফরিদপুরে কমিটিতে পছন্দের ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত না করায় হয়েছে বিক্ষোভ।

ঢাকার বাইরে থেকে স্থানীয় কার্যালয়প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

বিজ্ঞাপন

মৃত ব্যক্তি কমিটির সদস্য

সিলেটে যাচাই-বাছাই কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট মহানগর ইউনিটের কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ বলেন, সিলেট সদর উপজেলায় আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি যাচাই-বাছাই কার্যক্রম সামনে রেখে করা কমিটির সদস্য হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা মো. মন্তাজ মিয়ার নাম রাখা হয়েছে। পাঁচ মাস আগে তিনি মারা গেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ না রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এ কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

আবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, গতকাল গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ১৩ জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যক্রম মুলতবি রাখা হয়েছে। কমিটির সভাপতি মো. রফিকুল হকের পাকিস্তানি সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং যুদ্ধাহত না হওয়ার অভিযোগে ছয় মাস ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় তাঁকে সভাপতি করা সমর্থনযোগ্য নয়।

তবে রফিকুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা আমার বিরুদ্ধে ভুয়া কিছু অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগে এরই মধ্যে তদন্ত হয়েছে। বিষয়টি অভিযোগকারী প্রমাণ করতে পারেননি। আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নই—এ অভিযোগ নিয়েও তদন্ত রিপোর্ট শিগগির দেবেন সংশ্লিষ্টরা।’ তবে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাস ধরে তিনি ভাতা না পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

বিতর্কিত ব্যক্তির আবেদনে সাফাই

জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠা সেকেন্দার আলী (৬৫) নামের এক ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত করার আবেদন করেছেন। দুজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর সাফাই সাক্ষী হয়েছেন।

গতকাল যাচাই-বাছাই কমিটিতে সাক্ষাৎকারের জন্য সেকেন্দার আলী উপস্থিত হলে তাঁর বিতর্কিত ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁর বাড়ি ওই উপজেলার কোলা গণিপুর গ্রামে। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, সকাল ১০টায় উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়। বিকেল সাড়ে চারটায় সাক্ষাৎকার বোর্ডে সেকেন্দার আলীকে ডাকা হয়। তখন তাঁর দুই সাফাই সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন ও মোজাহার আলী সেখানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে দেখে রাজাকার-রাজাকার বলে গুঞ্জন শুরু করলে দুই সাক্ষী কেটে পড়েন। আর সাক্ষাৎকারে সেকেন্দার আলী বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় হলহলিয়া রেলসেতু পাহারা দিয়েছেন। পাকিস্তানি সেনারা জোর করে তাঁকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বলেন, ‘সেকেন্দার আলী মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিতর্কিত ভূমিকার কথা জানা ছিল না।’

বিজ্ঞাপন

ফরিদপুরে বিক্ষোভ

ফরিদপুরের সদরপুরে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটিতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে না রাখায় বিক্ষোভ করেছে আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী সংগঠনসমূহ ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড। কমিটিতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দুটি আবেদন জমা দেওয়া হয়।

গতকাল সকালে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে মিলনায়তনের আশপাশে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গফ্ফার মিয়ার নেতৃত্বে পরে আরেকটি বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়।

যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যসচিব ইউএনও রোকসানা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে কমিটির সদস্যদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। আমি আবেদনপত্র দুটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।

‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে সাক্ষ্য দিলে ভাতা বন্ধ’

নারায়ণগঞ্জ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে যাতে কোনো অসত্য তথ্য দেওয়া না হয়, সে জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে যাঁরা সাক্ষী দেবেন, তাঁদের ভাতা এক থেকে তিন বছর বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার গোকুলদাসের বাগ এলাকায় আমিজউদ্দিন এতিমখানার ছাত্রদের জন্য গতকাল শনিবার সকালে একটি হলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন মোজাম্মেল হক। এ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে কোনো কাগজপত্র লাগবে না। যদি সহযোদ্ধারা সাক্ষী দেন, তা-ই যথেষ্ট। যে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, তা অনুসরণ করে যাচাই-বাছাই হলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আসার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যদি কোথাও বরখেলাপ হয়, তবে সেটা বাতিলের ব্যবস্থা করা হবে।

সূত্র: ২২ জানুয়ারি ২০১৭, ৯ মাঘ ১৪২৩, রোববার, প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।