default-image

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশজুড়েই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল বহু সড়ক ও রেলসেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সড়ক, রেলপথসহ বহু অবকাঠামো। বাস-ট্রাক, পণ্যবাহী জাহাজ, সমুদ্রগামী জাহাজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে সরবরাহব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। তাই সরবরাহব্যবস্থা সচল করে অর্থনীতির চাঙাভাব ফিরিয়ে আনতে সার্বিকভাবে পুরো দেশের যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন পড়ে।

১৯৭২ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসে। ওই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্নির্মাণ’ শীর্ষক দুটি প্রতিবেদন তৈরি করে বিশ্বব্যাংক। প্রথম খণ্ডে ছিল সামষ্টিক অর্থনীতির পর্যালোচনা এবং দ্বিতীয় খণ্ডটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে। দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রস্তুত করেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন পরিবহন অর্থনীতিবিদ টিলম্যান নিউনার। তিনি সারা দেশ ঘুরে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

টিলম্যান নিউনারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় পরিবহন খাতে গাড়ি, রেল, জাহাজসহ অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ডলার। তখন ১ ডলারে ৭ টাকা ২৮ পয়সা পাওয়া যেত। মূলত বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিনিধিদলের প্রতিবেদনের মূল ভাষ্য ছিল, ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ নিরূপণ করা এবং কোন কোন খাতে কীভাবে পুনর্গঠন করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অর্থনীতি চাঙা করতে দ্রুততম সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, রেলপথ, সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। তখনকার উন্নয়ন বাজেটের প্রায় শতভাগই এসব কাজে খরচ হয়েছিল। তিনি আরও জানান, স্বাধীন-পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের জন্য বিদেশি সহায়তা এত প্রয়োজন ছিল যে ১৯৭৪ সালে এক বছরেই দুবার এইড কনসোর্টিয়াম বসাতে হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ৩০ জুন ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে যখন ঢাকা মুক্ত হলো, তখন আমরা পেলাম এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেউলিয়া অর্থব্যবস্থা। রেলপথ, সড়ক ও নদীসমূহ তখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন; নিমজ্জিত জাহাজ ও ভাসমান মাইন দিয়ে বন্দরসমূহ বন্ধ; শিল্পসমূহে শত্রুর আঘাতে বিধ্বস্ত বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত; যন্ত্রপাতি আর কাঁচামালের অভাবে কলকারখানা স্তব্ধ।’

বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জাতিসংঘের আওতায় রাষ্ট্রদূত সেইলরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৯৭২ সালের মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশ সফর করে। সেইলর প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, যানবাহন, নৌকা, জাহাজের ক্ষতি ছাড়া শুধু অবকাঠামো বিনষ্টের পরিমাণ ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্ত বাস ও ট্রাক মেরামতেই খরচের পরিমাণ ৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে জাহাজ ও নৌকার কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা হিসাব করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুটি বড় রেলসেতু ধ্বংস হওয়ার ফলে দেশের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে দেশের যত বাস ও ট্রাক ছিল, এর অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। ১৯৭০ সালের হিসাবে তখন ১০ হাজারের কম ট্রাক চলত। এসব ট্রাকের ধারণক্ষমতা ৬৫ হাজার টন। যুদ্ধের সময় সাড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তিযুদ্ধের সময় ২৯৫টি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর ক্ষতিগ্রস্ত সেতুগুলোর মধ্যে ৮২টি পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১৯৮টি সেতু সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়। রেলপথের পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, মেঘনা সেতু, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর ওপরের রেলসেতু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসেতুর সংখ্যা ১৭৫। যুদ্ধের পরপরই মাত্র ৮০ সেতু মেরামত করা সম্ভব হয়।

সূত্র: ২৬ মার্চ ২০১৭, ১২ চৈত্র ১৪২৩, রবিবার, প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন