default-image

শহীদ কামিনীকুমার ঘোষ দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীকাল আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। তবে আইনজীবী হিসেবে নন, তিনি সমাজে খ্যাত হয়েছিলেন শিক্ষানুরাগী হিসেবে ও জনহিতকর কাজের জন্য। পেয়েছিলেন ব্রিটিশদের দেওয়া ‘রায় সাহেব’ খেতাব। দীর্ঘ জীবনের সায়াহ্নকালে পাকিস্তানি বর্বর ঘাতক সেনাবাহিনী তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

কামিনীকুমার ঘোষের জন্ম ব্রিটিশরাজের সময়, ১৮৮৮ সালের ১ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের কাঞ্চনা গ্রামে। বাবা চৈতন্য চরণ ঘোষ, মা কমলা ঘোষ। তাঁর সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্যের উল্লেখ আছে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে। কিছু তথ্য আছে উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন সাইটে ও আগামী প্রকাশনীর শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে।

সেখান থেকে জানা যায়, ১৯০৬ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে পাস করেন তিনি। ১৯০৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক, ১৯১০ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে সম্মান এবং ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। আইনশাস্ত্রেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। দেশে ফিরে ১৯১৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম জজকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন।

কামিনীকুমার ঘোষ ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের অনুসারী। ১৯২১ সালে তিনি মহাত্মার ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হন। কাজ করেন চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রধান সংগঠক হিসেবে।

পেশাগতভাবে আইন ব্যবসা করলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন রায় সাহের কামিনীকুমার ঘোষ। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল খুব কম। এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

‘সাতকানিয়া-বাঁশখালী এডুকেশন সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করে এলাকায় বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। সাতকানিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এর প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঞ্চনা বয়েজ হাইস্কুল ও কাঞ্চনা জুনিয়র গার্লস স্কুল, চট্টগ্রাম জিলা স্কুল। এ ছাড়া কাঞ্চনায় একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

কামিনীকুমার ঘোষ দীর্ঘ প্রায় ৮৩ বছরের জীবন পেয়েছিলেন। জীবনের এই দিনগুলোকে ব্যয় করেছেন নানা জনকল্যাণমূলক কাজে। আইন পেশার পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনের আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য তিনি সাতকানিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২৮ বছর ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন সাত বছর। রায় সাহেব নিজ এলাকা কাঞ্চনা ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন ২৫ বছর। অনেক বছর তিনি জেল পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজ করেছেন এক্সাইজ লাইসেন্সিং বোর্ডে।

পাকিস্তানের ঘাতক সেনাবাহিনী একাত্তরে চট্টগ্রামে গণহত্যা শুরু করলে কামিনীকুমার ঘোষ প্রাণ বাঁচাতে পালানোর কথা ভাবতে পারেননি। ফলে দেশের মাটিতেই মিশে গেছে তাঁর রক্তধারা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোহাজারী ক্যাম্প থেকে একদল বর্বর সেনা একাত্তরের ২৫ এপ্রিল দুপুরে রায় সাহেবের বাড়িতে আক্রমণ চালায়। একজন রাজাকার তাঁকে চিনিয়ে দেয়। ঘাতকের দল নির্মমভাবে গুলি করে এই অশীতিপর শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়।


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান