default-image

হরিদাস সাহা ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সংস্কৃতিসেবী, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন রাজনীতিসচেতন মানুষ। ছাত্রদের কাছে তিনি যেমন ছিলেন প্রিয়, তেমনি বাংলা ও ইংরেজিতে ছিলেন খুবই দক্ষ। দেশপ্রেম ও স্বজাত্যবোধে ঋদ্ধ হরিদাস সাহা ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। ফলে রাজাকারদের বিরাগভাজন হন তিনি। পাকিস্তানি হানাদার সেনারা কসাইয়ের ভূমিকা নিয়ে হাত-পা বেঁধে তাঁকে গলা কেটে হত্যা করে।

বিজ্ঞাপন

হরিদাস সাহার জন্ম ১৯১১ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটির সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁরা তিন ভাই ও দুই বোন। তিনিই বড়। স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে তিনি ম্যাট্রিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বালিয়াটি ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর চার ছেলে ও চার মেয়ে। স্ত্রী আভারানী সাহা বেঁচে আছেন। তাঁর বয়স আশির কাছাকাছি।

একাত্তরের উত্তাল মার্চের ঘটনাপ্রবাহ সাটুরিয়ার বালিয়াটিকেও উত্তপ্ত করেছিল। ২৭ মার্চ বালিয়াটির পশ্চিম বাড়ির জমিদার জীতেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে যে বিশাল পতাকা মিছিল বের হয়েছিল, তাতে ছেলেদের নিয়ে শিক্ষক হরিদাস সাহাও অংশ নেন। তাঁর ছোট ছেলে মুক্তিযোদ্ধা সমীরপ্রসাদ সাহা এ মিছিলের জন্য স্থানীয় কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের এক দরজির কাছ থেকে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা তৈরি করে মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ ঘটনা সারা বালিয়াটিতে দারুণ আলোচিত হয়।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় বালিয়াটির স্থানীয় রাজাকাররা হানাদার সেনাদের খবর দিয়ে এই গ্রামে হামলা করায়। ছেলে সমীর সাহা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় শিক্ষক হরিদাস সাহার ওপর তারা ক্ষিপ্ত ছিল। প্রাণ বাঁচাতে হরিদাস সাহা সপরিবার বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে থাকতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ধামরাইয়ের আতুল্লা গ্রামে আশ্রয় নেন। রাজাকাররা হানাদারদের নিয়ে ২৯ আগস্ট বিকেলে নৌকায় করে আতুল্লা গ্রামে হানা দেয়। হানাদাররা হরিদাস সাহাকে ধরে ফেলে। খানিকটা দূরে গিয়ে তারা হরিদাস সাহাকে গলা কেটে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায়।

তখন দাহ করার পরিস্থিতি ছিল না। ঘাতক সেনা ও রাজাকাররা চলে গেলে ঘটনাস্থল থেকে বড় ছেলে সরোজপ্রসাদ সাহা কোনোরকমে বাবার লাশের মুখাগ্নি করে নদীতে ভাসিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে মানিকগঞ্জ সদরের খাবাশপুর আদর্শ ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক এবং মুক্তিযুদ্ধ পাঠ ও গবেষণা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহীদ হরিদাস সাহার ছবি ও তথ্য পাঠান। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে তাঁর মাঠপর্যায়ে গবেষণার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতি ও শ্রুতিতে মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ এবং ড. হারুন-অর-রশিদ সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ বইয়ে হরিদাস সাহার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া সাটুরিয়া উপজেলার বধ্যভূমিতে শহীদদের নামফলকেও হরিদাস সাহার নাম রয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ হরিদাস সাহার স্ত্রীর কাছে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি ও দুই হাজার টাকার অনুদান পাঠিয়েছিলেন। হরিদাস সাহার বৃদ্ধ স্ত্রী আভারানী বলেন, ‘আমার চোখের সামনে তাঁকে ধরে নিয়ে গেল। হানাদার সেনাদের হাতে-পায়ে ধরেও বাঁচাতে পারলাম না। স্বামীর কপালেও আজও শহীদের স্বীকৃতি মিলল না।’

গ্রন্থনা: আবদুল মোমিন, মানিকগঞ্জ