default-image

তরুণ ফুটবলার সুব্রত সাহা রাঙামাটি জেলা ফুটবল দলে নিয়মিত খেলতেন। বিভিন্ন সময় চট্টগ্রামের বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন। ভালো ভলিবলও খেলতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভলিবল দলের খেলোয়াড় ছিলেন। সময় পেলে হয়তো একজন কৃতী ক্রীড়াবিদ হতে পারতেন। কিন্তু সেই সুযোগ পাননি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন এই তরুণ ক্রীড়ানুরাগী।

বিজ্ঞাপন

শহীদ সুব্রত সাহার জন্ম ১৯৪৯ সালের ৩ মে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার স্বনির্ভর ইউনিয়নের মজুমদারখিল গ্রামে। বাবা কমল কৃষ্ণ সাহা ও মা হেমপ্রভা সাহা এখন বেঁচে নেই। তিনি পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই প্রিয়দর্শী সাহা প্রথম আলোকে জানান, বড় ভাই সুব্রত সাহা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। শৈশব থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। রাঙামাটির হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ের অনেক প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। বিভিন্ন জেলায় ফুটবল খেলার আমন্ত্রণও পেতেন। একবার আমন্ত্রিত হয়ে ভারতেও ফুটবল খেলেন।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার খায়রুল বশর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সুব্রত সাহা ভারতের টাবলুং এলাকায় প্রশিক্ষণ নেন। পরে মেজর মো. রফিকের অধীনে ১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাঙ্গুনিয়া থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরুল আলমের লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: রাঙ্গুনিয়া-১৯৭১ গ্রন্থে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত সাহার ছবি ও যুদ্ধে বীরত্বের কথা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, একাত্তরের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি নায়েক আবুল হাশেম ও পুলিশের কনস্টেবল শহর মুল্লুক ছুটিতে তাঁদের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ায় আসেন। দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাঁরা আর ফিরে যাননি। রাঙ্গুনিয়া খিলমোগল রসিক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এলাকার তরুণদের নিয়ে ১২ মার্চ থেকে তাঁরা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। এতে ৩৬ জন যুবক অংশ নেন। সুব্রত সাহাও তাঁদের মধ্যে ছিলেন। পরে তিনি ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে শহীদ হন সুব্রত। সেদিন ছিল ১০ ডিসেম্বর। তাঁরা পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত সাহা, স্বপন চৌধুরী, নুরুন্নবী, শংকর সাহা ও শচীন দেওয়াঞ্জী যুদ্ধের একপর্যায়ে রাঙামাটির কাউখালীর সিংহনাথ চাকমার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু রাজাকাররা জানতে পেরে পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের জানিয়ে দেয়। খুব সকালে হানাদার সেনারা বাড়িটি ঘেরাও করে তাঁদের আটক করে। এর মধ্যে সুব্রত সাহা, স্বপন চৌধুরী ও নুরুন্নবীকে ঘাতকেরা তাঁদের গাড়ির সঙ্গে বেঁধে ছেঁচড়ে রাঙামাটি সদরে ডিসির বাংলোতে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পথেই তাঁরা শহীদ হন। অন্য দুজনকে রাঙামাটিতে এনে হত্যা করা হয়।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মায়ের কাছে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি ও দুই হাজার টাকার অনুদান পাঠিয়েছিলেন। শহীদের সরকারি তালিকায় সুব্রত সাহার নাম রয়েছে। সুব্রত সাহার ছবি দিয়ে তাঁদের গ্রামে একটি ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে। উপজেলার ডিসি সড়কের মরিয়মনগর চৌমুহনী থেকে মজুমদারখিল পর্যন্ত ‘শহীদ সুব্রত সাহা সড়ক’ নামকরণ করা হয়েছে।

গ্রন্থনা: আব্বাস হোসাইন, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম