default-image

মাথার খুলির পেছনে গুলি লেগেছিল প্রকৌশলী মো. শফিকুল আনোয়ারের। ধানখেতের ভেতরে পড়ে ছিল তাঁর মৃতদেহ। শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নিজস্ব এয়ারলাইনস গড়ে তোলার জন্য নিজের জ্ঞান আর অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। তা আর পূরণ হলো না।

শফিকুল আনোয়ারের জন্ম ফেনীর ছাগলনাইয়া গ্রামে ১৯৩৯ সালে। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসে (পিআইএ) তিনি শিক্ষানবিশ যন্ত্র প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে। ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি পিআইএর বোয়িং বিমানগুলোর মেইনটেন্যান্স প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন ১৯৬৫ সালে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত এখানেই ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বেই তিনি এতে অংশ নিয়েছিলেন। পিআইএর বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। এর পুরোভাগে ছিলেন শফিকুল আনোয়ার। অসহযোগে অংশ নেওয়া পিআইয়ের কর্মীদের সরকার কাজে যোগ দিতে বললেও তিনি আর কাজে ফেরেননি। হানাদার পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করলে তিনি ২৫ মার্চের পর সপরিবার গ্রামে চলে যান।

ফেনীর গ্রামাঞ্চলেও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ড শুরু করে। তাদের সহযোগী রাজাকার-আলবদররা চালাতে থাকে লুটপাট। এ অবস্থায় শফিকুল আনোয়ার হানাদারদের প্রতিরোধ করতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে সংগঠিত করতে থাকেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, খবরাখবর দেওয়াসহ নানাভাবে তাঁদের সহায়তা করেন।

দিনটি একাত্তরের ২৮ অক্টোবর। ছাগলনাইয়ার লেমুসা গ্রামে হাট বসে। শফিকুল আনোয়ারের কাছে খবর ছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ছদ্মবেশে হাটে আসবে তথ্য সংগ্রহ করতে। দুপুরে তিনি হাটে গেলেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। রাজাকাররা আচমকা হাটে হামলা চালায়। পাশেই থাকা ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি সেনারা এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।

শহীদ শফিকুল আনোয়ারের ছেলে সাইফুল আনোয়ার এসব বর্ণনা করেছেন ‘আমার বাবা’ নামের এক লেখায়। বাংলা একাডেমি থেকে রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি: ১৯৭১ বইতে (পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ড)। তিনি লিখেছেন, ‘ফেনী ট্রাংক রোড ও খদ্দর রোডের সংযোগস্থল, বর্তমান এশিয়ান হাইওয়ে, এখানেই রাজাকাররা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে হত্যা করে। সেদিন রাতে কারফিউ জারি করায় কেউ আর তাঁর খোঁজে বাড়ি থেকে যেতে পারেনি। পরদিন খুব ভোরে রাস্তার পাশের ধানখেতে মাথার পেছন দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাবার লাশ পাওয়া যায়। চারটি অবুঝ শিশু যাদের বয়স যথাক্রমে সাড়ে ছয়, পাঁচ ও দুই বছর এবং মাত্র ১২ দিন, তারা বুঝতেও পারল না তাদের বাবা কোথায় চলে গেলেন। অবরুদ্ধ অরক্ষিত বাংলাদেশে তিনি তাঁর প্রিয় স্বজনদের রেখে লাখো শহীদের কাতারে গিয়ে শামিল হলেন।’

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান।

বিজ্ঞাপন