default-image

পাবনাসহ পুরো উত্তরবঙ্গে আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মো. আমিনউদ্দীন। ১৯৬৭ সালে পাবনার ঐতিহাসিক ভুট্টা চাষবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে নয় মাস জেল খেটেছিলেন। সত্তরের নির্বাচনে পাবনার ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাবনা জেলা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল মো. আমিনউদ্দীনকে তাঁর শহরের গোপালপুরের লাহিড়ি পাড়ার বাসা থেকে রাতে ধরে নিয়ে যায়। এদিন শহরের আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করে। সেনাবাহিনীর এই দল সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য পাবনায় এসেছিল। এর পর থেকে তারা পাবনাতেই অবস্থান করছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী মো. আমিনউদ্দীনসহ অন্যদের তৎকালীন ইপসিক (বর্তমানে বিসিক) শিল্পনগরে আটক রেখে অকথ্য নির্যাতন চালায়। তারপর ২৯ মার্চ তাঁকেসহ আটক হওয়া প্রায় সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনার বিবরণ রয়েছে আমিনউদ্দীনের স্ত্রী সাহারা বানুর রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘...ছাব্বিশ মার্চের কালরাতে উদ্বিগ্নচিত্তে তিনি [মো. আমিনউদ্দীন] যখন ঘরের মধ্যে পায়চারী করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তে সদর দরজার সামনে গাড়ির আওয়াজ আর ভারী বুটের শব্দে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়লাম। কালবিলম্ব না করে ওদের বাবাকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি নিজেই দরজা খুললেন। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর পাকসেনারা তাঁকে গ্রেফতার করে জিপে তুলে নিয়ে চলে গেল। ধীর, শান্ত অথচ দৃঢ়চেতা মানুষটিকে নিয়ে চলে যাবার পর থেকে ঐ রাতের ঘটনা আমার স্মৃতিতে নেই। গ্রেফতারের পরের ঘটনাবলী আরও মর্মান্তিক, আরও করুণ। ছাব্বিশে মার্চের রাত থেকে উনত্রিশে মার্চ পর্যন্ত শহরের উপকণ্ঠে বিসিক শিল্প নগরীর অন্ধকার কক্ষে অসহনীয় অত্যাচার আর নির্যাতন চালিয়ে রাজনৈতিক নেতা এবং নিরীহ সরলপ্রাণ মানুষসহ আমার স্বামীকেও হত্যা করে। পাবনার আপামর জনগণের প্রিয় নেতা, নন্দিত জনপ্রতিনিধিকে জল্লাদ ইয়াহিয়ার জিঘাংসার শিকার হতে হলো উনত্রিশে মার্চের নির্জন বিকেলে।’ (আমার স্বামী, স্মৃতি: ১৯৭১, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

মো. আমিনউদ্দীনের জন্ম নাটোর জেলার লালপুর থানার গৌরীপুর গ্রামে, ১৯২১ সালে। বাবা হারুন-অর রশীদ, মা হাকিমন নেছা। তাঁর পড়াশোনা জয়পুরহাট, রাজশাহী সরকারি কলেজ, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে অবিভক্ত বাংলার সিভিল সাপ্লাই বিভাগের ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন। তাঁর কর্মস্থল ছিল কলকাতায়। কলকাতায় চাকরিকালে বিএল প্রথম পর্ব শেষ করেন। শেষ পর্ব সমাপ্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বিজ্ঞাপন

ভারত ভাগের কিছুদিন পর মো. আমিনউদ্দীন আইন ব্যবসায়ে মনোনিবেশ করেন। প্রায় একই সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে এসে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হন। তাঁর সঙ্গে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

১৯৫২ সালে পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিচর্চা, আমৃত্যু আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সম্পাদক, পাবনা পৌরসভার চেয়ারম্যান, জুবিলী হাইস্কুলের সেক্রেটারি ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও পাবনা আইন কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মো. আমিনউদ্দীন। কলেজটি বর্তমানে তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। সরকারি মহিলা কলেজ ও সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। স্বাধীনতার পর পাবনার প্রধান সড়ক ও কয়েক বছর আগে পাবনা স্টেডিয়াম তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ বছর থেকে পাবনায় তাঁর নামে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

মো. আমিনউদ্দীন তিন ছেলে ও পাঁচ কন্যাসন্তানের জনক। ছেলে ফিরোজ মো. শামসুল আরেফিন, ফরিদ মো. সাইফুল আরেফিন ও ফারুক মো. সাদরুল আমিন। মেয়ে দিলরুবা শিরীন, সালমা বিন, মরিয়ম বেগম, রুবিনা আয়েশা পারভিন ও শারমিম শিরীন।

সূত্র: ফিরোজ মো. শামসুল আরেফিন (শহীদ মো. আমিনউদ্দীনের জ্যেষ্ঠ ছেলে)। স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (পঞ্চম পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৫) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান