default-image

সেদিন দুপুরে খেতে বসেছিলেন সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদ। এমন সময় জমের মতো হাজির হলো পাকিস্তানি সৈনিকেরা। তুলে নিয়ে গেল খাবার শেষ করার আগেই। হাত ধোয়ারও সময় দেয়নি ঘাতকেরা।

শহীদ সাংবাদিক নিজামুদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের যুদ্ধের সংবাদ পাঠাতেন। বিবিসির প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজ করতেন পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালে (পিপিআই)। তাঁর জন্ম ১৯২৯ সালে মুন্সিগঞ্জের পদ্মাপারের মাওয়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে তিনি সেই বিভীষিকাময় রাতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়লে একাত্তরের এপ্রিলের দিকে পরিবারকে গ্রামের বাড়ি মাওয়ায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ঢাকাতেই ছিলেন। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। পরে পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

ঘাতকেরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল একাত্তরের ১২ ডিসেম্বর। সেদিন সকাল থেকে বাসায় টানা একটা পর্যন্ত টাইপ করেছেন (টাইপরাইটারে সংবাদ লিখতেন)। লেখা শেষ করে স্ত্রীকে দুপুরের খাবার দিতে বলেন। তিনি যখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসেছেন, তখন ঘাতকেরা তাঁর বাড়িতে হানা দেয়।

বিজ্ঞাপন

নিজামুদ্দীন আহমদের স্ত্রী কোহিনুর আহমদ সেদিনের ঘটনার মর্মস্পর্শী দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন স্মৃতি:১৯৭১-এ। (রশীদ হায়দার সম্পাদিত, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)। তিনি লিখেছেন, ‘দেখেই আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তারা যেন সাপের মতো হিসহিস করছে।...পালিয়ে যাওয়ার তো কোনো পথ নেই! ওরা সদর দরজায়। আমি ভাবছি কোন দিক দিয়ে গেলে নিজাম সাহেবকে আড়াল করা যায়, আর তিনি ভাবছেন ঘরের মেয়েদের যেন কিছু করতে না পারে। তাই ওরা যখন ডাক দিল, তখন আমি বাধা দেওয়ার আগেই তিনি বেরিয়ে এলেন।...ওরা আইডেনটিটি কার্ড দেখতে চায়। উনি দেখান।...তিনি নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে বুকে বন্দুক ধরে বলল হ্যান্ডস আপ। ইংরেজিতে তিনি বললেন, আমাকে হাত ধুয়ে আসতে দাও। কিন্তু দিল না। ততক্ষণে আমার ছেলেমেয়েদের কান্নার রোল শুরু হয়ে গেছে। আমার বড় মেয়ে আল্লাহ আল্লাহ করছে। ওর বুকে বন্দুক ধরে বলল—“আল্লাহ মাৎ বালো”।’ এরপর ঘাতকেরা সামনে-পেছনে বন্দুক ধরে নিজামুদ্দীন আহমদকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান