default-image

ড. সিদ্দিক আহমদ বিজ্ঞানের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি করে ১৯৬৭-৬৮ সালে দেশে ফিরে বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) যোগ দেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রকাশ্যেই মুক্তিবাহিনীর জন্য অর্থ প্রদান করেন। এ ছাড়া রসায়নের ছাত্র হিসেবে বিস্ফোরক তৈরির কাজে শুধু সহায়তাই নয়, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে সরঞ্জামও সরবরাহ করেন। দেশকে ভালোবেসেছিলেন এত গভীরভাবে যে তখন তিনি বালিশের নিচে বাংলাদেশের পতাকা রেখে ঘুমাতেন।

১৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে আটটার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ-দেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর মুখোশধারী সদস্যরা সিদ্দিক আহমদ ও ড. আমিনউদ্দিনকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির কলোনির ফ্ল্যাট থেকে ধরে নিয়ে যায়। এর পর থেকে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সেদিনের ঘটনায় জানা যায় কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন ও ড. আমিনউদ্দিনের স্ত্রী সুরাইয়া আমিনের রচনা থেকে। সেলিনা হোসেন লিখেছেন, ‘...১৪ ডিসেম্বর। মণীষা বিল্ডিংয়ের একতলায় দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম ইপিআরটিসির লাল রঙের যাত্রীবাহী কোচ ঢুকল সায়েন্স ল্যাবরেটরির কলোনির চত্বরে। সামনের মাঠের ধারে দাঁড়িয়েছে গাড়ি, খাকি পোশাক পরা কয়েকজন তরুণ চটপট নেমে দৌড়ে গেল সামনের বিল্ডিংয়ে, ওখানে ড. সিদ্দিক এবং ড. আমিনউদ্দিন থাকতেন। আকাশে মুহুর্মুহু বিমান হামলা, শহরে কারফিউ আমাদের বাইরে বেরুনো নিষেধ। নিষেধ নয় ওদের, যারা হন্তারক, ঘাতক—দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কলজেটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ছুটোছুটি করছে শহরময়। এদের তৈরি নীলনকশার খবর জানত না শহরের অনেকে, জানতেন না ড. সিদ্দিকও।’ (আমার প্রতিবেশী, স্মৃতি: ১৯৭১, ৫ম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৯২, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

ড. আইনউদ্দিনের স্ত্রী সুরাইয়া আমিন লিখেছেন, ‘...সেই দুর্যোগের মধ্যে আততায়ীরা কলোনীতে এলো...। হাতে তাদের নামের তালিকা। পাশবিক উল্লাসে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে নেকড়ের ক্ষিপ্রতায় খুঁজতে লাগলো ড. আমিনউদ্দিন, ড. সিদ্দিক আহমদ ও শামসুল আলমকে। কেউ যে আর একজনকে সতর্ক করে দেবে, কার্ফ্যুর জন্য সে সুযোগ ছিল না।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৮, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

বিজ্ঞাপন

সিদ্দিক আহমদের একটি মন্তব্য জানলেই বোঝা যায় কী দৃঢ় চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি। সেলিনা হোসেন লিখেছেন, ‘...কোনো আন্তরিক মুহূর্তে এই মানুষটির ব্যক্তিত্বও আমার কাছে উদ্ভাসিত নয়। আমি বাইরে থেকে দেখেছি তাঁর তারুণ্যের দীপ্তি, ভেতরের মানুষটিকে দেখা হয়েছে কতকগুলো কথা শোনার মধ্য দিয়ে। সে কথাগুলো তাঁর মুখ থেকে সরাসরি শুনিনি।...সায়েন্স ল্যাবরেটরির কলোনির মধ্যে কিংবা বাইরে যারা বলেছে—বলেছে দৃঢ় কণ্ঠে অথচ ফিসফিসিয়ে।...প্রয়াত কবি হুমায়ুন কবিরের হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে মাসিক চাঁদা ধরিয়ে দেয়া। তখন ড. সিদ্দিকের সেই কথাগুলো কি ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল আমাকে—আমার প্রতিবেশীদেরকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। কিন্তু তাঁর উপলব্ধ, চেতনা আমাকে এই একুশ বছর পরও তাড়িত করে।...

‘তখন [১৯৭১] চারদিকের জামাতী আর তবলীগের প্রচণ্ড দাপট। তারা ইসলাম ধর্ম-সংক্রান্ত এবং সেই মুহূর্তে পালনীয় কর্তব্য সম্পর্কে নানা ধরনের লিফলেট ও কাগজপত্র বাড়ি বাড়ি দিয়ে যেত। একদিন এমন দু-তিনজন লোক ড. সিদ্দিকের বাড়িতে গেলেন। তিনি ওদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবার আগে বললেন, আপনারা আমাকে ইসলাম ধর্মের কথা বলতে এসেছেন? এই মুহূর্তে চলে যান এখান থেকে। আমার স্ত্রী আমাকে ভালোবেসে এদেশে এসেছে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। এখন ধর্মের নামে আপনাদের এসব বীভৎস নিষ্ঠুর কাজ দেখে ও আবার খ্রিষ্টান হয়ে যেতে চায়।’ (সূত্র: ঐ)

উল্লেখ্য, সিদ্দিক আহমদের স্ত্রী ছিলেন সুইডিস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী একমাত্র পুত্রসন্তানসহ সুইডেনে ফিরে যান। সিদ্দিক আহমদ তাঁর স্ত্রীর নাম রেখেছিলেন ফাতিমা ও ছেলের নাম ওমর। ছেলে বর্তমানে সেখানেই বসবান করেন।

সিদ্দিক আহমদের জন্ম ফেনীতে, ১৯৩৭ সালে। তাঁর বাবা-মায়ের নাম পাওয়া যায়নি।

স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (পঞ্চম পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৫) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান