default-image

বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন ড. মোহাম্মদ আমিনউদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিবাহিনীর জন্য অর্থ সংগ্রহ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেন। কিন্তু তাঁর কর্মস্থলে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের দাপট। জামায়াতিদের কাছে তাঁর কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে। এ খবর তারা পৌঁছে দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ দেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর কাছে।

১৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে আটটার দিকে আলবদর বাহিনীর মুখোশধারী সদস্যরা তাঁকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির কলোনির বি-১৯ ফ্ল্যাট থেকে ধরে নিয়ে যায়। এর পর থেকে তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

সেদিনের ঘটনার বিবরণ জানা যায় তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া আমিনের ‘আমার স্বামী’ রচনা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘...১১ ডিসেম্বর কয়েক ঘণ্টার জন্য কার্ফু শিথিল করলে তাঁর তিন তরুণ বন্ধু বাসায় এসে কলোনী ছেড়ে অন্য কোথাও কিছুদিনের জন্য চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি বলেছিলেন, “পরাজিত সৈন্যরা কখনো শহরের ভিতরে অত্যাচার করার সময় পাবে না।” স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনা-সংক্ষুব্ধ অনিশ্চয়তার নয় মাসের সম্ভাব্য পরিস্থিতি অগ্রবীক্ষণে তিনি অসাধারণ দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন; কিন্তু ভুল তাঁর হয়েছিল একটাই-ধর্মোন্মাদ আলবদরদের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি সঠিক আঁচ করতে পারেননি। ...১৪ ডিসেম্বর ভোর থেকেই আমি জরুরি প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস একটি বাক্সে ভরে বার বার তাঁকে বাসা ছেড়ে সপরিবারে অন্য কোথাও চলে যাবার জন্য চাপ দিচ্ছিলাম, কিন্তু আমার ভাই মঞ্জু তাঁকে বাধা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমাদের আর সায়েন্স ল্যাবরেটরি কলোনি ত্যাগ করা সম্ভব হয়নি। আমার স্বামীরও অবশ্য বাসা ছেড়ে পালানোর ব্যাপারে দোদুল্যমানতা ছিল। ...ত্রাসের মধ্যে সেদিন ভোর থেকে অনিশ্চিত ও উদ্বেগাকুল সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। ...কার্ফুবন্দী ভীতসন্ত্রস্ত কলোনিবাসীদের অসহায়ের মতো মুহূর্ত গোনা ছাড়া উপায় ছিল না। সেই দুর্যোগের মধ্যে সকাল সোয়া আটটার দিকে আততায়ীরা কলোনিতে এলো...। হাতে তাদের নামের তালিকা। পাশবিক উল্লাসে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে নেকড়ের ক্ষিপ্রতায় খুঁজতে লাগলো ড. আমিনউদ্দিন, ড. সিদ্দিক আহমদ ও শামসুল আলমকে। কেউ যে আর একজনকে সতর্ক করে দেবে, কার্ফ্যুর জন্য সে সুযোগ ছিল না। সেই সময় আমার স্বামী আমাদের আড়াই মাসের একমাত্র পুত্রসন্তান আয়নের মুখে দুধের ফিডার ধরে রেখেছিলেন; আমি ছিলাম রান্নাঘরে। সাড়ে আটটার সময় নরপিশাচরা আঘাত করল বাসার প্রবেশ দ্বারে। ...তিনি নিজেই দরজা খুললেন। কালো মুখোশধারী চারজন যুবক রাইফেল হাতে ড. আমিনউদ্দিনের পরিচয় জেনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর উপর। আমি স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। মঞ্জুর সঙ্গে একটু কথা-কাটাকাটি হতেই তাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে কাঁধে আঘাত করল এক মুখোশধারী। তারপর রাইফেলের নলের মুখে আমার স্বামীকে তাঁরই গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে টেনে বের করে নিয়ে গেল নরপিশাচরা। ...আমি স্বামীকে আর ফিরে পাইনি।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৮, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

মোহাম্মদ আমিনউদ্দিনের আদি পৈতৃক নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার শিউরিতে। ১৯৩৬ সালের ৯ জুলাই এখানে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোহাম্মদ কাইউম, মা মোসলেমা খাতুন। ভারত ভাগের সময় তাঁর চাচার সঙ্গে তিনি পাবনার কালাচাঁদ পাড়ায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ১৯৫৪ সালে ইস্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারি বোর্ড (ঢাকা) থেকে প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে বিএসসি (সম্মান) দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও ১৯৬০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি পাস করেন।

মোহাম্মদ আমিনউদ্দিন কিছুদিন এডরুক ওষুধ কোম্পানিতে রসায়নবিদ হিসেবে চাকরি করেন। ১৯৬১ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে রসায়নবিদ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। ১৯৬৮ সালে পিএইচডি অর্জন করে ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তিনি সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। প্রত্যয় নামের একটি সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। তাঁর একমাত্র সন্তান গাফফার আমিন আয়ন চিকিৎসক। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত।

স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৩) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

[email protected]

বিজ্ঞাপন