default-image

জহিরুল ইসলাম বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও তাঁর মূল পরিচয় ছিল কথাশিল্পী হিসেবে। বাঁধাধরা চাকরিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। আবার জীবিকার জন্য প্রকাশকদের ফরমাশ অনুসারে গল্প, উপন্যাস বা নোট লিখতেও ছিল তাঁর প্রবল আপত্তি।

ছাত্রজীবন থেকেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। এই দলের সদস্যও ছিলেন। ভারত ভাগের পর এ দেশে এসে ঢাকার প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে), পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন। বন্ধু নাট্য সংস্থা ও ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য এবং উন্মেষ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের প্রথম সভাপতি ছিলেন। কবি জসীমউদ্‌দীনের সাহিত্য সাধনা সংঘ ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার সংরক্ষণ কমিটির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

জহিরুল ইসলামের উপন্যাসগুলোর নাম অজগাঁয়ের বেগম, ব্রীজের তলায় থাকি, অন্য নায়ক, মেয়েরা পর্দানশীল, সূর্যমুখী, অগ্নিসাক্ষী প্রভৃতি। লিখেছেন অনেক গল্প ও প্রবন্ধ।

একাত্তরের ১ এপ্রিল জহিরুল ইসলাম বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে জিঞ্জিরায় গিয়েছিলেন। রাতে সেখানেই ছিলেন। পরদিন ২ এপ্রিল ভোরে জিঞ্জিরায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন শুরু করে। সেনাবাহিনীর এই অপারেশনে সেদিন অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। এ সময় চুনকুটিয়া গ্রাম থেকে নিখোঁজ হন তিনি। ধারণা করা হয়, ওই দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। পরে তাঁর মরদেহ হয়তো কোনো গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।

জহিরুল ইসলাম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় স্মৃতি: ১৯৭১ গ্রন্থে। ‘আমার বন্ধু’ শিরোনামে রচনায় মহসিন শস্ত্রপাণি লিখেছেন, ‘১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর গ্রেপ্তার এড়াতে [তিনি] চলে এলেন ঢাকায়। তখন তিনি যুক্ত ছিলেন সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে। আইনগত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে তিনি স্থায়ীভাবে নির্বাসিত হলেন ঢাকায়।...

‘আন্দোলনমুখিতা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর মধ্যে কোনো রকম পিছুটান বা আপসকামিতা কেউ লক্ষ করেননি।...যেকোনো দুঃখী মানুষের সঙ্গে আলাপ করতেন আপনজনের মতো। তাঁর মধ্যে ছিল বেশ খানিকটা একরোখা ভাব। কোনো তত্ত্ব বা কর্মসূচি একবার সঠিক বলে গ্রহণ করলে তার আলোচনায় বা আন্দোলনে লেগে-পড়ে থাকতেন অক্লান্তভাবে। আত্মপ্রচারের লোভ বা মোহ তাঁর চেতনাকে গ্রাস করতে পারেনি।...

‘এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে আমার কর্মস্থল দৈনিক আজাদ-এ রাতের শিফটে পৌঁছে একটা বার্তা পেলাম। ছোট চিরকুট। জহিরুল ইসলাম এক তারিখে বাসা ছেড়ে গেছেন, আর ফেরেননি। আমার বুঝে নিতে বিলম্ব হলো না। তবু অনুসন্ধানের ব্যর্থ চেষ্টা।...জানলাম মুনিরুল ইসলাম বাদল (অভিনেতা) ও তাঁর শ্যালক শাহ আলমের সাথে গেছেন নদীর ওপারে। নদী পার হয়ে আন্দাজমতো গিয়ে পৌঁছালাম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের (হোমিও চিকিৎসক) বাড়িতে। তিনি বাড়ি ছিলেন না। তাঁর মায়ের সাথে কথা বলে জানলাম—এ বাড়িতেই সঙ্গীদের সাথে ছিলেন জহিরুল ইসলাম ১ তারিখ রাতে। ২ তারিখ ভোরে পাকবাহিনী আক্রমণ চালালে তাঁর সঙ্গীরা বাড়ি ছেড়ে চলে যান তাঁকে ফেলে রেখে। পরে তিনি বেরিয়েছিলেন একা। তিনি কি ছুটে গিয়েছিলেন আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করতে? (দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)

বিজ্ঞাপন

তাঁর পারিবারিক নাম সৈয়দ জহিরুদ্দিন ইসলাম হলেও জহিরুল ইসলাম নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ মার্চ। স্থায়ী নিবাস পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার মৈনান গ্রামে। বাবা সৈয়দ লুৎফর রহমান চিশতি। ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করলেও নানা প্রতিকূল কারণে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬৫ সালে। ওই বছরই তিনি একা পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে চলে আসেন।

জহিরুল ইসলাম নিখোঁজ হওয়ার সময় গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডের এক ভাড়া বাসায় থাকতেন। বিবাহিত ছিলেন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার এক মাস তিন দিন পর একমাত্র মেয়েসন্তান জন্মগ্রহণ করে। মেয়ের নাম সৈয়দা জারকা জহির। স্ত্রী নাঈমা জহির। তিনি গেন্ডারিয়ার মনিজা রহমান স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন।

স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (পঞ্চম পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৬) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

<[email protected]>