default-image

দুঃসাহসী এক মানুষ ছিলেন গোলাম হোসেন। মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি একাই ইউরোপে চলে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিরে আসেন। একাত্তরে তিনি বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন।

অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে গোলাম হোসেন এই আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে একাত্মতা ঘোষণা করেন। ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বরিশালের পুলিশ সুপারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় সাংসদ নূরুল ইসলাম মঞ্জু ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের অধিনায়ক মেজর জলিলের হাতে ১০০ রাইফেল তুলে দেন। ২৯ মার্চ পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে দিয়ে অবশিষ্ট অস্ত্রগুলোও প্রতিরোধযোদ্ধাদের দেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। সহকর্মী ও কোর্ট ইন্সপেক্টর জোনাব আলীর বাসায় তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা তখন তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এ বাসা থেকেই ২ মে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে হত্যা করে অজ্ঞাত কোনো স্থানে মরদেহ মাটিচাপা অথবা নদীতে ফেলে দিয়েছে। হত্যার সঠিক তারিখ পরিবারের সদস্যরা জানেন না।

গোলাম হোসেন সম্পর্কে জানা যায়, তাঁর স্ত্রী সৈয়দা জাকিয়া বানুর আমার স্বামী রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘বরিশালের সেই আগুনঝরা সংগ্রামী দিনগুলির কথা আজও মনে পড়ে। আমাদের বাংলার সামনে দিয়ে যখন উত্তেজিত জনতার মিছিল যেত, আমার স্বামী হাত তুলে তাদের অভিনন্দন জানাতেন। অনেক দামাল ছেলে হয়তো অনেক সময় পুলিশ লাইনের মধ্যে ঢুকে যেত, তিনি বলতেন, এখন নয়, সময় হলে আমি তোমাদের ডেকে নেবো, আমি তোমাদেরই।...

‘১৮ এপ্রিল হানাদার বাহিনী বরিশালে চলে আসে এবং অনেকে গোলাম হোসেনের বিরুদ্ধে নানা কথা বলে এবং কে বা কারা গোলাম হোসেন সাহেবের রাইফেল বণ্টনের ছবি ও ভাষণ টেপ করে রেখেছিল, সেগুলি ব্রিগেডিয়ার আতিক, মেজর এহিয়া, মেজর আসলামের হাতে অর্পণ করে। আমার সুমহান দেশপ্রেমিক স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমার স্বামীর কোনো স্মৃতিচিহ্ন আমি পাইনি। তিনি ভালো কাজের পুরস্কারস্বরূপ পিপিএম মেডেল পেয়েছিলেন। হানাদার বাহিনী ও বরিশালের স্থানীয় লোক, সাথে পুলিশের লোকও ছিল—এরা সবাই মিলে আমার বাসার সমুদয় জিনিসপত্র লুটপাট করেছিল।...

‘আমার স্বামীকে কিভাবে কোথায় হত্যা করা হয়েছিল কিছু সঠিকভাবে আজও জানতে পারলাম না। লোকমুখে শুনেছি, তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। কোর্ট ইন্সপেক্টর জোনাব আলীর বাসায় আমার স্বামীকে আশ্রয় দিয়ে হানাদার বাহিনীকে খবর দিয়েছিল। সেখান থেকে হানাদার বাহিনী আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশ ১৯৮৯, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

গোলাম হোসেনের জন্ম ১৯১৯ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায়। বাবা খান সাহেব গোলাম রব্বানী। তিনিও ব্রিটিশ শাসনামলে পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন এবং পুলিশ সুপার হিসেবে অবসর নেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরে।

গোলাম হোসেন ১১ বছর বয়সে ইউরোপ চলে যান। ফলে তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিরে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। আইএ প্রথম বিভাগে পাস করে স্কলারশিপ পান। বিএ পড়ার সময়ই তৎকালীন বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসে সাব ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করেন। ভারত ভাগের পর চলে আসেন বাংলাদেশে (তখন পূর্ব বাংলা)। বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা বিভাগ, ঢাকা ও কুষ্টিয়াতে চাকরি করার পর পদোন্নতি পেয়ে বরিশাল যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় তিনি চুয়াডাঙ্গায় এসডিপিও (মহকুমা পুলিশ প্রশাসক) ছিলেন। তখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেও তিনি তা পালন করেননি।

গোলাম হোসেন এক সন্তানের পিতা। তাঁর ছেলের নাম মোহসীন মো. ইকবাল।

স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৭) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

[email protected]