default-image

মেধাবী ছাত্র ছিলেন আইনজীবী আবদুল জব্বার। বাবা ও তাঁর নিজেরও স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন, কিন্তু মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিজের পছন্দে বিয়ে করায় পরিবার থেকে লেখাপড়ার আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হতোদ্যম হননি তিনি। সংসার, সন্তান ও পড়াশোনা চালিয়েছেন খুব কষ্ট করে।

রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। একাত্তরে নওগাঁ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) শাখা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে ৩০ বছরের আবদুল জব্বার আর ঘরে বসে থাকেননি। এলাকার তরুণদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে তিনি নিজেও চলে যান ভারতে।

আবদুল জব্বারের ছোট ছেলে সারোয়ার হাসানের কাছ থেকে জানা যায়, এপ্রিলের গোড়ার দিকে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বালুরঘাটে যান। সেখানে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে একটি শিবির প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ-যুব সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য রিক্রুট করার দায়িত্বে ছিলেন।

১৯ আগস্ট কয়েকজন সহযোগীসহ তিনি ভারত থেকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের নিজ এলাকায় আসছিলেন। তাঁর হাতে ছিল কাপড়ের ব্যাগ, পরনে লুঙ্গি। ব্যাগে ছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার প্রচারপত্র। তাঁদের সঙ্গে ছিল একজন পথপ্রদর্শক। সে তাঁদের নিয়ে ভুলক্রমে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ধামইরহাট কলেজের সামনে একটি সেতুতে চলে আসে। এই সেতু পাহারায় ছিল একদল রাজাকার। পাশেই ফার্সিপাড়ায় ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। সেনাদের নেতৃত্বে ছিল এক পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন। আবদুল কাইয়ুম নামে রাজাকার দলের একজন আবদুল জব্বারকে চিনতে পারে। রাজাকারেরা আবদুল জব্বার ও তাঁর সঙ্গীদের আটক করে সেনাক্যাম্পে হস্তান্তর করে।

পরে আবদুল জব্বারকে ফার্সিপাড়ায় স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মোজাফফর চৌধুরীর বাড়িতে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সম্পর্কে তথ্য জানতে একপর্যায়ে তাঁকে ওই বাড়ির বাইরে একটি বড় আমগাছে দুই হাতে বড় পেরেক মেরে ঝুলিয়ে বেয়নেট দিয়ে খঁুচিয়ে খঁুচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

তাঁর মরদেহ পরিবারের সদস্যরা পাননি। স্থানীয় গ্রামবাসী তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ মাটিচাপা দিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে পরিবারের সদস্যরা তাঁর কবর খঁুজে পান।

নওগাঁ জেলার ছোট যমুনা নদীসংলগ্ন বক্তারপুর গ্রামে ১৯৪১ সালের ৪ জানুয়ারি আবদুল জব্বারের জন্ম। বাবা আহমদ আলী সরদার, মা ছতুন বেওয়া। ১৯৫৬ সালে নওগাঁ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালে বিয়ে করায় তাঁর পরীক্ষা দিতে এক বছর দেরি হয়। ১৯৬১ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে বিএ এবং ১৬৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করেন। এরপর আইন পেশায় যোগ দেন। তিনি নওগাঁ কোর্টে ওকালতি করতেন।

সংস্কৃতিসেবী ও খেলাধুলাপ্রিয়ও ছিলেন আবদুল জব্বার। নাটক করতে খুবই ভালোবাসতেন। নাটক পরিচালনায় ছিলেন নিষ্ঠাবান। সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর অনুরাগ। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করে এলাকায় সুনাম অর্জন করেছিলেন। ব্যাডমিন্টন ও ফুটবল খেলাতেও ছিলেন পারঙ্গম।

শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যুৎসাহী। নওগাঁয় ডিগ্রি কলেজ না থাকায় বর্তমান নওগাঁ সরকারি কলেজকে ডিগ্রি পর্যায়ে উন্নীত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

আবদুল জব্বার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। বড় ছেলে জাহিদ আনোয়ার ২০১৩ সালে মারা গেছেন। মেজো ছেলে ফারুক আহমেদ চাকরিজীবী ও ছোট ছেলে সারোয়ার হাসান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। বর্তমানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল। মেয়ে রাজিয়া সুলতানা ও জাকিয়া সুলতানা। দুজনই গৃহিণী। স্ত্রী গোলাপ জান।

সূত্র: সারোয়ার হাসান। স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৭) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

[email protected]