default-image

স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হন মুসলিমউদ্দীন মিয়া। কলকাতার রিপন কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি। দেশভাগের পর নিজের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঝাওয়াইলে চলে আসেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু স্কুলশিক্ষক হিসেবে। ‘মুসলিম মাস্টার’ নামেই পরিচিত ছিলেন। পাড়া ঘুরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, পরিচিতদের কাছে তিনি অনুরোধ করতেন তাঁদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। দীর্ঘকাল তিনি বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন। নিজের পকেট থেকে অন্য শিক্ষকদের বেতনও দিয়েছেন।

মুসলিমউদ্দীন মানুষকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতেন। ঝাওয়াইলে একটি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবছর ফুটবল টুর্নামেন্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৌকাবাইচের আয়োজন করতেন। এভাবে অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে জড়ান তিনি।

মুসলিমউদ্দীন মিয়ার মেয়ে বিলকিস জাহান বাবার এসব কাজ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বাবা নিজে উদ্যোগী হয়ে গ্রামে যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। পাকা ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি করেছেন নিজের চেষ্টায়। গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা তিনি ছাত্রদের নিয়ে তৈরি করেছেন, মাটি ফেলে উঁচু করেছেন। ছাত্ররাও বিনা বাক্যব্যয়ে খাতা-কলম রেখে শিক্ষকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কোদাল হাতে নিয়েছে। গ্রামে একটি কমিউনিটি সেন্টারও তাঁর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে (স্মৃতি: ১৯৭১, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)।’

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে মুসলিমউদ্দীন মিয়া এতে একাত্মতা ঘোষণা করেন। স্কুল বন্ধ করে দেন। বিলকিস জাহান তাঁর স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে তাঁর বাবা ৭ মার্চ ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি তখন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ভাষণ শুনে এসে গ্রামের ছেলেদের নিয়ে একটি কমিটি করেন। যুদ্ধ শুরু হলে গ্রামের তরুণদের তিনি প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে পাঠাতে শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, আর্থিক সহায়তাসহ নানাভাবে তাঁদের সহায়তা করতেন।

যুদ্ধের সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের বেতনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জুন মাসের দিকে খবর আসে সরকার শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে। শিক্ষকেরা তাঁকে অনুরোধ করেন টাঙ্গাইল শহরে গিয়ে বেতনের টাকা তুলে আনতে। মুসলিমউদ্দীন পরিবারের সবার নিষেধ উপেক্ষা করে ২৭ জুন টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হন। টাঙ্গাইল গিয়ে তিনি জেলা শিক্ষা অফিসে শিক্ষকদের বেতনের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বের হওয়ার পরপরই রাজাকাররা তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। আশপাশের অনেকে, শিক্ষা অফিসের কর্মচারীরা ঘটনাটি দেখেছেন। কিন্তু কেউ তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। রাজাকারদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন জনদরদি মুসলিম মাস্টার।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান