শহীদ বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, রাজশাহী

বিজ্ঞাপন
default-image

মো. আমিনউদ্দিন পেশায় ছিলেন বিজ্ঞানী। ঢাকা বিজ্ঞান গবেষণাগারের উচ্চতর গবেষণা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যেমন গবেষণা করেছেন, তেমনি সাহিত্যবিষয়ক লেখালেখি ও পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। এর পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে, সহায়তা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এসব কারণে জামায়াতপন্থী সহকর্মীরা একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিল রাজাকার-আলবদরদের হাতে।

সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতির দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন শহীদ বিজ্ঞানী আমিনউদ্দিনের স্ত্রী সুরাইয়া আমিন, ‘সকাল সোয়া আটটার দিকে আততায়ীরা কলোনিতে এল একটা জিপে চেপে। তাদের হাতে নামের তালিকা। ...সেই সময় আমার স্বামী আমাদের আড়াই মাসের একমাত্র পুত্রসন্তান আয়ানের মুখে দুধের ফিডার ধরে রেখেছিলেন; আমি ছিলাম রান্নাঘরে। ...তিনি নিজেই দরজা খুললেন। কালো মুখোশধারী চারজন যুবক রাইফেল হাতে ড. আমিনউদ্দিনের পরিচয় জেনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর ওপর। ...তারপর রাইফেলের নলের মুখে আমার স্বামীকে তাঁরই গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে টেনে বের করে নিয়ে গেল নরপিশাচেরা।’ (স্মৃতি: ১৯১৭, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)।

আমিনউদ্দিন ছিলেন ঢাকা বিজ্ঞান গবেষণাগারের (এখন সায়েন্স ল্যাব নামে সর্বাধিক পরিচিত) প্রকৃতি গবেষণা বিভাগের উচ্চতর গবেষণা কর্মকর্তা। রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি বামপন্থী। থাকতেন বিজ্ঞান গবেষণাগারের আবাসনের বি-১৯ নম্বর বাড়িতে। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ৯ জুলাই, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার শিউড়িতে। বাবা মোহাম্মদ আবদুল কাইউম। তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, সে সময় ভারত ভাগ হলে চাচার সঙ্গে তিনি পাবনায় চলে আসেন। এখানে কালাচাঁদ পাড়ায় তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

আমিনউদ্দিন ১৯৫৪ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক ও ১৯৫৬ সালে প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে রসায়নশাস্ত্রে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন পাবনার এডরুক নামের ওষুধ কোম্পানিতে। ১৯৬১ সালে তিনি রসায়নবিদ হিসেবে ঢাকা বিজ্ঞান গবেষণাগারে যোগ দেন।

১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে আমিনউদ্দিন ভূমিকা রাখেন। তা ছাড়া বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতি এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তির প্রবল প্রতিবাদী ভূমিকায় ছিলেন তিনি। শহীদ আমিনউদ্দিন সম্পর্কে এসব তথ্য রয়েছে বাংলা একাডেমি ও আগামী প্রকাশনীর শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে।

উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিভাগীয় বৃত্তি পেয়ে আমিনউদ্দিন ১৯৬৪ সালে লন্ডন যান। ইউনিভার্সিটি অব ব্রাডফোর্ড থেকে পিএইচডি করেন। ফিরে এসে ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিজ্ঞান গবেষণাগারের উচ্চতর গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।

মার্চের শুরুতে আমিনউদ্দিন ‘দেশের ডাকে দিল সাড়া/ প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা’ নিজের লেখা এই স্লোগানসংবলিত ব্যানারসহ সমমনা সহকর্মীদের নিয়ে বিজ্ঞান গবেষণাগার থেকে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বন্ধু ও সহকর্মীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। শহীদ আমিনউদ্দিনের বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ‘পলিমার বিজ্ঞানের উৎপত্তি ও অগ্রগতি’।

বিজ্ঞানী আমিনউদ্দিনকে রাজাকাররা বাসা থেকে কোথায় তুলে নিয়ে যায়, তা জানা যায়নি। তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়নি।


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান

বিজ্ঞাপন