default-image

আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নওগাঁ ও রাজশাহী অঞ্চলে সুনাম কুড়িয়েছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। পাশাপাশি গান ও অভিনয়ে পারদর্শী ছিলেন। একাত্তরের ২৫ মে আত্রাইয়ের সিংসাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে মোহাম্মদ হানিফসহ ২৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা।

মোহাম্মদ হানিফের জন্ম ১৯৪১ সালে বর্তমান ভোলা জেলা সদরের পশ্চিম চরনোয়াবাদ গ্রামে। বাবা হাবিবুর রহমান ও মা জমিলা খাতুন। তিনি ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। ১৯৭১ সালে তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ শাখায় জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। আবৃত্তি শেখাতেন আত্রাই আবৃত্তি পরিষদে।

বিজ্ঞাপন

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে শহীদ মোহাম্মদ হানিফ সম্পর্কে তথ্য ও ছবি পাঠান সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আল মেহমুদ রাসেল। নওগাঁর মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত তাঁর রক্তঋণ ১৯৭১: নওগাঁ গ্রন্থে মোহাম্মদ হানিফের জীবনী রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মোহাম্মদ হানিফ নওগাঁর আত্রাইয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। এ কথা স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনারা জেনে যায়। বিষয়টি তিনিও আঁচ করতে পেরে একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি কর্মস্থল আত্রাইয়ের আহসানগঞ্জ থেকে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রাজিয়া বুলবুল ও তাঁর এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে আত্রাই থেকে চার কিলোমিটার দূরে সিংসাড়া গ্রামে তাঁর সুহৃদ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মকবুল হোসেন মণ্ডলের বাড়িতে রেখে আসেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকতেন।

একাত্তরের ২৫ মে রাতে মোহাম্মদ হানিফ স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে সিংসাড়া গ্রামে যান। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি চেয়ারম্যানের বাড়িতেই স্থানীয় ৩০-৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে বৈঠকে বসেন। রাজাকাররা বিষয়টি জানতে পেরে হানাদার সেনাদের খবর দেয়।

রাতেই আত্রাই ও নাটোর সেনাক্যাম্প থেকে গাড়ি নিয়ে ৬০-৭০ জন পাকিস্তানি সেনা সিংসাড়া গ্রাম ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন। দুই পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ গোলাগুলির পর মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি ফুরিয়ে যায়। এরপর হানাদার সেনারা মোহাম্মদ হানিফসহ ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে। পরদিন গ্রামবাসী চেয়ারম্যান মকবুল হোসেন মণ্ডলের বাড়ির পাশেই হানিফসহ ২৯ জন শহীদকে কবর দেন।

বিজ্ঞাপন

সেদিন শরীরে গুলি লাগার পরও বেঁচে যাওয়া সিংসাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মফিজ দেওয়ান বলেন, ‘সিংসাড়া সমাজকল্যাণ সংঘ’ নামে স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করা হয়েছিল। মোহাম্মদ হানিফ এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং অর্থ দিয়ে সহায়তা করছিলেন।

একাত্তরে নওগাঁর আত্রাই এলাকায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছে ‘ওহিদুর বাহিনী’ নামে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন সাবেক সাংসদ ওহিদুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহীদ মোহাম্মদ হানিফ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছেন ও প্রচুর আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। তিনি আমার কাছে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। এভাবে সর্বমোট ৮০ হাজার টাকা তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দেন। ওই সময় ৮০ হাজার টাকা অনেক।’

শহীদ মোহাম্মদ হানিফের স্ত্রী রাজিয়া বুলবুল জীবিত আছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর অতি কষ্টে সন্তানদের পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করেছেন। ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ছোট ছেলে মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের জন্য বাবার আত্মদানের কথা ভেবে গর্ববোধ করি। রাষ্ট্র বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’ ভোলা জেলা সদরে শহীদ স্মৃতিফলকে তাঁর নাম রয়েছে। ভোলা ও নওগাঁর আত্রাইয়ে প্রতি বছর তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠান হয়।

মোহাম্মদ হানিফসহ একাত্তরের ২৫ মে সিংসাড়া গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে সিংসাড়া বধ্যভূমিতে শহীদ স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। তাতে শহীদ হানিফসহ ২৯ জন শহীদের নাম রয়েছে।

গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, নওগাঁ