default-image

মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালি তখন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত হলো প্রবাসী সরকার। মুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল এ ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু সেদিন এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায় অত্যন্ত মেধাবী বাঙালি সেনা কর্মকর্তা প্রকৌশলী লে. কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল কাদিরের পরিবারে। বাড়ি থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় অবাঙালি ঘাতক সেনারা।

শহীদ লে. কর্নেল আবদুল কাদির রাওয়ালপিন্ডি থেকে সত্তরের মাঝামাঝি বদলি হয়ে আসেন চট্টগ্রামে। তাঁকে জর্ডানে পাকিস্তান দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশে করে পাঠানোর প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁকে চট্টগ্রামে তেল ও গ্যাস উন্নয়ন করপোরেশনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি থাকতেন শহরের পাঁচলাইশ এলাকায়।

দেশের পরিস্থিতি দিনে দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। অবশ্যম্ভাবী মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে তিনি হয়তো আগাম আঁচ করতে পেরেছিলেন। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করতেন তিনি। করপোরেশনের পক্ষ থেকে তিনি ১০ হাজার টাকা আওয়ামী লীগের তহবিলে দানও করেন।

বিজ্ঞাপন

আবদুল কাদিরের বড় ছেলে সাংবাদিক নাদীম কাদিরের ‘আমার বাবা’ নামে একটি স্মৃতিচারণামূলক লেখা রয়েছে রশীদ হায়দার সম্পাদিত বাংলা একাডেমির স্মৃতি: ১৯৭১ বইয়ের পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ডে। সেখানে তাঁর বাবার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। তিনি লিখেছেন, তাঁদের পাঁচলাইশের বাড়িতে প্রায় রাতেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজুমদার, লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী, মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমসহ অনেকেই গোপন সভায় মিলিত হতেন। তাঁর বাবা সেনানিবাসের ভেতরের খবর পৌঁছে দিতেন স্বাধীনতাকামীদের কাছে। যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে তিনি বেশ কিছু বিস্ফোরকও তাঁদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

মার্চের প্রথম দিকে আবদুল কাদির তাঁর বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা তোলেন। নাদীম কাদির লিখেছেন, ‘কালো পতাকা আর বাংলাদেশের বিরাট পতাকা আমাদের বাড়িতে উত্তোলন করা হলো। সবাই মানা করল, কিন্তু পাপা কিছুতেই শুনলেন না, আমাদের কী আনন্দ!’ এর পরিণতি হলো মারাত্মক। তাঁদের পরিবারের জন্য ১৭ এপ্রিল কালোদিন বলে উল্লেখ করে তিনি বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘সকাল ৯টা হবে। জোরে কলিং বেল, দরজায় জুতার শব্দ আর পোষা কুকুর দুটোর চিৎকার। একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে তিনজন গেল বাবাকে খুঁজতে সোজা শোবার ঘরে। বলল কঠোর স্বরে “তুমি গাদ্দার, তৈরি হয়ে যাও, আমাদের সঙ্গে যাবে।” একটা নীল জিপে করে নিয়ে গেল। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির জানালা দিয়ে শেষবারের মতো পিতা-পুত্র একে অপরকে দেখলাম। তিনি হাত উঠিয়ে খোদা হাফেজ বললেন। সেই যে গেলেন আর এলেন না।’

শহীদ আবদুল কাদিরের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায়, জন্ম ১৯২৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে যোগ দেন।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান

বিজ্ঞাপন