default-image

লালমনিরহাট রেলওয়ে সিপি স্কুলের সহকারী শিক্ষক মোস্তফা হাসান আহমেদকে একাত্তরের ১৯ এপ্রিল ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিন সকালে শহরের মাস্টারপাড়ার বাসার সামনে লালমনিরহাট মডেল স্কুলের ফুটবল খেলার মাঠ থেকে স্থানীয় উর্দুভাষী অবাঙালিরা ‘মেজর সাহেব ডেকেছেন’ বলে ডেকে নিয়ে তাঁকে জবাই করে হত্যা করে।

শহীদ মোস্তফা হাসানের বড় ছেলে বর্তমানে লালমনিরহাট জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাফিজ ফেরদৌস ও ছোট মেয়ে নাজনীন সাথী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মায়ের সন্তান প্রসবের সময় হয়ে আসছিল। তাই তাঁরা ঝুঁকি সত্ত্বেও একাত্তরে অবাঙালি–অধ্যুষিত লালমনিরহাট শহরের মাস্টারপাড়ার বাসাতেই ছিলেন।

মোস্তফা হাসান ১৯২৮ সালে কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জের উত্তর ফেনুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আবদুল মোত্তালেব, মা লতিফা খাতুন। তিনি অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার আলিপুরদুয়ার ম্যাকউইলিয়াম স্কুল থেকে ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৫০ সালে একই কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। মোস্তফা হাসান আহমেদ ১৯৬৩ সালে লালমনিরহাট রেলওয়ে সিপি স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এর আগে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রেভিনিউ সার্কেল অফিসার (আরসিও) পদে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন থানায় চাকরি করেন। ষাটের দশকে লালমনিরহাট শহরের মাস্টারপাড়ায় নতুন বাড়ি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

হাফিজ ফেরদৌস জানান, তাঁর বাবার শহীদ হওয়ার বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত। ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের চার শতাব্দীর লালমনিরহাট, কবি ও গবেষক মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাকের ৭১ এর অল্প কথা, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বইতে শহীদ বুদ্ধিজীবী মোস্তফা হাসান আহমেদের হত্যার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ প্রামাণ্য অনুষ্ঠানে লালমনিরহাটের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মোস্তফা হাসান অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে একাত্তরে সিপি স্কুলটি বেসরকারি স্কুল ছিল বলে রেলওয়ের বিভাগীয় শহীদের তালিকায় তাঁর নাম আসেনি।

হাফিজ ফেরদৌস বলেন, তাঁদের বাড়িতে একটি রেডিও ছিল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে এলাকার অনেক বাঙালি তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁদের বাড়িতে বাংলা দৈনিক পত্রিকা রাখা হতো। অনেকে পত্রিকা পড়তেও আসতেন। এলাকার প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা আসতেন। নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। স্থানীয় অবাঙালিরা এসব বিষয় ভালো চোখে দেখত না। পাকিস্তানি ঘাতক সেনারা গণহত্যা শুরু করলে অবাঙালিরা তাঁর বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

মোস্তফা হাসানের স্ত্রী সেলিমা আহমেদ ১৯৬৪ সালে লালমনিরহাট গার্লস স্কুলে (বর্তমানে সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়) সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ১৯৯৩ সালে চাকরি থেকে অবসরে যান এবং ২০০০ সালে ইন্তেকাল করেন। এই দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে চারজন জীবিত রয়েছেন। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

গ্রন্থনা: আবদুর রব, লালমনিরহাট

বিজ্ঞাপন