default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মুহম্মদ আবদুল মুকতাদির ছিলেন অগ্রসর চিন্তাচেতনার মানুষ। ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-আন্দোলন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদে ও সত্য বলায় তিনি ছিলেন নির্ভয়।

মুহম্মদ আবদুল মুকতাদির থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার ১২ নম্বর ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে। একাত্তরের ২৫ মার্চের সেই কালরাতে তিনি গর্ভবতী স্ত্রীসহ নিজ ফ্ল্যাটেই ছিলেন। মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায়। গোলাগুলি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেলে তিনি ওই ভবনেরই তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে আশ্রয় নেন। সকালে সেনারা ওই ফ্ল্যাটে এসে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

সেদিনের এ ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানা যায় তাঁর মেয়ে ইলোরা মুকতাদিরের রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘বাবাকে আমি দেখিনি, বাবা বলে কখনও কাউকে সম্বোধন করা হয়নি। বাবা কী? বাবার ভালোবাসা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করিনি।...

বিজ্ঞাপন

‘কোনো এক ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পত্রিকাতে প্রকাশিত সকল বুদ্ধিজীবীর সাথে আমার বাবার ছবি দেখতে পেলাম।...এর পরই মা আমাকে তাঁর করুণ স্মৃতি শোনালেন। বললেন, পত্রিকাতে যাকে দেখছো ইনিই তোমার বাবা শহীদ আবদুল মুকতাদির।...

‘মা বললেন...১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় হল ও এলাকায় হামলা চালায়। হঠাৎ রাত এগারটার সময় গোলাগুলি শুরু হলো। মানুষের আর্তনাদ—জ্বালানো হচ্ছে বাড়ি ঘর—আকাশ লাল হয়েছিল সেদিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্র হয়ে গেল।...আমার বাবা নিচতলায় থাকতেন।...অত্যন্ত ভয় পাচ্ছিলেন মা। তাই বাবা তাকে নিয়ে সেই ভবনের তিনতলায় ড. সৈয়দ আলী নকী সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সারারাত তারা ভয়াবহ গর্জন ও ভীতির মাঝে জেগে ছিলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকার—মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে, সৈন্যদের গাড়ির আওয়াজ, মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। এ ভাবে ভোর হয়ে গেল।...এমন সময় হঠাৎ দেখা গেল ১০/১৫ জন সিপাহি, হাতে একটি কাগজ, এলাকার ভিতরে ঢুকে এই ভবনের দিকেই আসছে।...সৈন্যরা নিচে তাদের ডাকছেন। আলী নকী সাহেব নিচে গেলেন—উনার সাথে উপরে উঠে এল ৪/৫ জন সৈন্য। বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন বাবা মা। ভিতরে ঢুকেই বাবাকে নির্দেশ করে বলেছিল “তুম জয় বাংলা বলতা, পাকিস্তান নেহি চাহতা।”...সঙ্গে সঙ্গে গুলির পর গুলিতে বাবার বুক ও পেট ঝাঝরা হয়ে গেল। মা তখন চিৎকার করে প্রাণভিক্ষা চাইলে তাকে তিরস্কার করে ফেলে দিয়ে সে বাড়িতে আর একজনকে হত্যা করে।

‘বাবাকে মেরেই ক্ষান্ত হয় নি—মায়ের সামনে টেনে তিন তলা থেকে তাঁর মৃতদেহ নিচে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ভৃত্য যাকে বাবা ভালোবেসে খাবারের ভালো অংশ দিতেন, সে বাবাকে কোলে তুলে ব্রিটিশ কাউন্সিলে নিয়ে আসে। পরদিন কার্ফিউ ভাঙ্গলে আমার নানা, খালু, মামা সূর্যসেন হল থেকে মৃতদেহ নিয়ে এসে দাফন শেষে নানার পারিবারিক গোরস্থানে চিরশয্যায় শায়িত করে।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, ষষ্ঠ খণ্ড, প্রকাশ ১৯৯৩, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

মুহম্মদ আবদুল মুকতাদিরের জন্ম ১৯৪০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলার সিলাম গ্রামে। সিলেট রাজা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৫৬), সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে আইএসসি (১৯৫৮), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (১৯৬০) ও এমএসসি (১৯৬২) পাস করেন। ১৯৬৭ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাইড্রোলজির ওপর স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমা করাকালে ব্রিটিশ সরকারের কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির অধীনে হাইড্রোলজির ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্সও করেন।

১৯৬৩-৬৪ সালে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ওয়াপদা) ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু বেশি দিন এই সংস্থায় না থেকে ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রভাষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। ফিরে এসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। একাত্তরে ঊর্ধ্বতন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

মুহম্মদ আবদুল মুকতাদির একমাত্র কন্যাসন্তান ইলোরা মুকতাদিরের জনক।
স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৩) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
[email protected]

বিজ্ঞাপন