default-image

পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী নিরপরাধ সাধারণ বাঙালিদের ওপর যে ঘৃণ্য বর্বর গণহত্যা চালিয়েছিল, তা থেকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কেউ রেহাই পায়নি। কর্মজীবন থেকে অবসরে চলে যাওয়া অনেক বয়োবৃদ্ধ মানুষকে তারা শুধু হত্যাই করেনি, পাকিস্তানের দোসর রাজাকার-আলবদর আর অবাঙালিদের নিয়ে অমানুষিক নির্যাতনও চালিয়েছিল। ঘাতক রাজাকার-আলবদরদের এমনি নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের প্রবীণ শিক্ষক ও আইনজীবী মুনীন্দ্র কুমার সরকার।

শহীদ মুনীন্দ্র কুমার অবসরজীবনে সমাজকল্যাণমূলক কাজ করছিলেন। বয়স তখন ৭৬ বছর। ঘাতকেরা তাঁকে রেহাই দেয়নি। কারণ, তাঁর দুই ছেলে অজয় কুমার সরকার ও সঞ্জয় কুমার সরকার সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এ জন্য নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।

মুনীন্দ্র কুমারের জন্ম লক্ষ্মীপুর জেলার চরমটুয়া গ্রামে ১৮৯৫ সালে। সচ্ছল-সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল তাঁদের। ১৯১৪ সালে তিনি লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরপর ১৯১৬ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কলেজ থেকে অঙ্কশাস্ত্রে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি নেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

বিজ্ঞাপন

মুনীন্দ্র কুমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে। পরে তিনি নোয়াখালীর ফরাশগঞ্জ এসে শিক্ষকতায় যোগ দেন। কিছুদিন শিক্ষকতা করে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন। পরে আবার ফিরে যান শিক্ষকতায়।

নোয়াখালীর বেশ কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন মুনীন্দ্র কুমার। শিক্ষকতায় ফিরে প্রথমে তিনি রামগতি বি বি কে উচ্চবিদ্যালয় ও পরে হাজীরহাট উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা করেছেন নোয়াখালী অরুণচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ে। অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে সারা নোয়াখালীতেই তাঁর খুব সুনাম ছিল। মুনীন্দ্র কুমার সরকারের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে। এ ছাড়া আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থেও তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য রয়েছে।

মুনীন্দ্র কুমার সরকার ছিলেন আট সন্তানের জনক। একাত্তরে পাকিস্তানি ঘাতক সেনারা গণহত্যা শুরু করলে তাঁর দুই ছেলে অজয় ও সঞ্জয় মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। বিষয়টি স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা জানত। সুযোগ বুঝে তারা ঘাতক সেনাদের সহায়তায় একাত্তরের ২৮ আগস্ট মুনীন্দ্র কুমারের বাড়িতে আক্রমণ করে তাঁকে আটক করে নিয়ে যায়। ছেলেদের খোঁজ জানতে চেয়ে অকথ্য নির্যাতন চালায় তাঁর ওপর। তারপর হত্যা করে মৃতদেহটি দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে দেয় বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে। মুনীন্দ্র কুমারের মৃতদেহটি আর পাওয়া যায়নি।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান