default-image

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষ দিনগুলো কাটছিল তখন। বিজয়ের জন্য উন্মুখ দেশের মুক্তিকামী জনতা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাভব মেনে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নতজানু হওয়ার আনুষ্ঠানিকতাই শুধু বাকি। সেই মুহূর্তে হানাদার ও তাদের দোসর খুনি রাজাকারের দল বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় জড়িত বাঙালিদের হত্যার যে ঘৃণ্যতম ষড়যন্ত্র করেছিল, তার শিকার হয়েছিলেন আইনজীবী মফিজুর রহমান।

দিনটি ছিল একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর। পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার আবুল খয়রাত রোডের বাড়িতে প্রতিদিনের মতোই রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়েন আইনজীবী মফিজুর রহমান। রাত নয়টার দিকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। তিনি বিছানা ছেড়ে দরজা খুলতে যাবেন, কিন্তু স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাধা দেন। তাঁর মন কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। ওদিকে বাইরে থেকে তখন দরজায় শুরু হয়েছে প্রবল ধাক্কা। মফিজুর রহমান একপ্রকার নিরুপায় হয়েই দরজা খুলে দেন। হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে কালো মুখোশে অস্ত্রধারী দুই পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকারের দল।

বিজ্ঞাপন

ফাতেমা বেগম সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতিচারণা করে বলেন, বাঙালিদের একজন ‘উনিই উকিল সাহেব’ বলে তাঁকে চিনিয়ে দেয়। এরপর ঘাতকের দল তাঁকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে বলে জানিয়ে ঘরে তল্লাশি চালাতে থাকে। আলমারি খুলে তাঁর দুটি ডায়েরি নিয়ে নেয়। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে পরদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে মফিজুর রহমানকে তুলে নিয়ে যায় তারা। এরপর আর পরিবার তাঁর কোনো সন্ধান পায়নি।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে শহীদ আইনজীবী মফিজুর রহমানের ছোট ছেলে জিয়াউর রহমান তাঁর বাবার ছবি এবং ময়মনসিংহ আইনজীবী সমিতি থেকে দেওয়া সনদসহ বিভিন্ন তথ্য পাঠান। সেই সূত্রে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়।

শহীদ মফিজুর রহমানের জন্ম ১৯৩৮ সালে ময়মনসিংহ শহরের কৃষ্টপুর এলাকায়। তাঁর বাবা খলিলুর রহমান ছিলেন কৃষিজীবী, মা জিন্নাত খাতুন গৃহিণী। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে তিনি করাচি মহাবিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দিয়ে আইন পেশা শুরু করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ম্যাজিস্ট্রেট বজলুর রহিমের মেয়ে ফাতেমা রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি ঢাকার বংশাল এলাকাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের দুই ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বড় ছেলে মসিউর রহমানের বয়স ছিল দুই বছর। তিনি এখন একটি বিমান সংস্থার চাকুরে। ছোট ছেলে জিয়াউর রহমান ব্যবসায়ী। তাঁদের মায়ের বয়স ৭৬, তিনি সুস্থ আছেন। ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে শহীদ আইনজীবীদের স্মরণে নির্মিত ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামের স্মৃতিফলকে ৫ নম্বরে মফিজুর রহমানের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির শহীদ স্মৃতিসৌধের নামফলকে ৬ নম্বর নামটি তাঁর।

জিয়াউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার জন্য তাঁর বাবা জীবন উৎসর্গ করলেও এখনো তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাননি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য লিখিত আবেদন করেছেন।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান, ঢাকা

বিজ্ঞাপন