default-image

ঢাকা সেনানিবাসে শামসুল করিম খানকে ভয়ংকর নির্যাতন করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট। গোপনে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাঁকে আটক করে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা।

শহীদ সার্জেন্ট শামসুল করিম খানের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বেরুয়া গ্রামে। তবে তাঁর জন্ম মিয়ানমারে, ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি। তাঁর বাবা চিকিৎসক ফজলুল করিম খান চাকরিসূত্রে তখন মিয়ানমারে থাকতেন। ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তিনি।

বিজ্ঞাপন

শামসুল করিম ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও আপসহীন। ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি কর্তাব্যক্তিদের মোটেই তোয়াজ-তোষামোদ করতেন না। বরং বাঙালিদের প্রতি কোনো কটূক্তি করলে তিনি উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতেন। এসব কারণে চাকরিতে তাঁর পদোন্নতি হচ্ছিল না। পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৯ সালে সুযোগ আসে ঢাকায় কাজ করার। পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখতেন।

এ সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী বেগম নিলুফার খানম স্মৃতিচারণায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন—‘সত্তরের ঝড়ের রাতে হঠাৎ চারটার দিকে ঘুম ভেঙে দেখি তিনি নেই। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঘণ্টা দেড়েক পর ফিরে এসে বললেন, “এত চিন্তা করবে না। আমি একটু অফিসে গিয়েছিলাম। দেশ তো স্বাধীন হয়েই যাচ্ছে—এ দেশের সবকিছু আমাদের—তাই দেখে এলাম সব ঠিকঠাক আছে কি না (স্মৃতি: ১৯৭১, রশীদ হায়দার সম্পাদিত, পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি)।”’

একাত্তরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শামসুল করিমকে ১১ পাঞ্জাবি সেনার একটি দলের দলপতি করে গোলাবারুদসহ পাবনার ঈশ্বরদীতে পাঠানো হয়েছিল। নিলুফার খানম তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘শামসুল হক গোপনে ঈশ্বরদীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর তাঁর দলের পাঞ্জাবি সেনাদের হত্যা করেন। গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের একটি ঘাঁটিতে আক্রমণ করে উড়িয়ে দেন। বিষয়টি একটা পর্যায়ে ঢাকা সেনানিবাসে জানাজানি হয়ে যায়। তখন ঢাকা সেনানিবাসে থাকা তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের আটক রাখা হয়।’

পাকিস্তানি ঘাতক সৈনিকেরা সার্জেন্ট শামসুল করিমসহ বিমানবাহিনীর ছয় কর্মীকে আটক করে নির্মম নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে তাঁদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল তাঁর, নিজের জীবন উৎসর্গ করে তা সম্পন্ন করে গেছেন শহীদ সার্জেন্ট শামসুল হক খান।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান।

বিজ্ঞাপন