default-image

শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, একদিন দেশ স্বাধীন হবে। নিজেকে সে জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে যখন তিনি কাজ শুরু করবেন বলে উদ্‌গ্রীব, তখনই চিকিৎসক মোহাম্মদ মোর্তজাকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে নির্মমভাবে।

মোহাম্মদ মোর্তজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ছিলেন। লেখালেখিও করতেন। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চণ্ডীপুরে তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ১ এপ্রিল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। মেডিকেলে পড়ার সময় কলকাতায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। নিজদেশ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন।

তাঁর স্ত্রী সাঈদা মোর্তজা লিখেছেন, মোহাম্মদ মোর্তজা উপলব্ধি করেছিলেন ‘সমাজের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন না করলে ডাক্তার হয়ে মানুষের দুর্দশা মোচন করা যায় না।...ডাক্তাররা হয়তো সাময়িকভাবে রোগের উপশম করতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই চিকিৎসা অর্থহীন। এই সমাজের চিকিৎসা না হলে ডাক্তার হয়ে লাভ নেই (স্মৃতি:১৯৭১, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, বাংলা একাডেমি)।’

বিজ্ঞাপন

ডা. মোর্তজা ভাবতেন, সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের অন্যায়গুলো তুলে ধরবেন। গল্প, কবিতা, নাটক, মার্ক্সীয় দৃষ্টিতে সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সাঈদা মোর্তজা তাঁর লেখায় জানিয়েছেন, অফিসে রোগী দেখার সময় শেষ হলে মোর্তজা চলে যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। সেখান থেকে রাতে বাড়ি ফিরে বই নিয়ে থাকতেন রাত দুই-তিনটা পর্যন্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি হলেই মোহাম্মদ মোর্তজা পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল কোথাও না কোথাও চলে যেতেন দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসার জন্য। গরিব মানুষের চিকিৎসা করে কোনো দিন অর্থ নেননি। পোশাক-আশাক, চলাফেরায় খুবই সাদাসিধা ছিলেন তিনি। সাঈদা এক মজার কথা লিখেছেন, ‘একবার তাঁকে আমি তিন টাকা গজের কাপড় দিয়ে শার্ট করে দিয়েছিলাম। শার্ট তো কোনো দিন পরেনইনি, উপরন্তু এ নিয়ে আমাকে প্রচুর তিক্ত কথা শুনিয়েছেন।’

সত্তরের শেষ দিকে মোর্তজা চাকরি ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রামে চলে যেতে চেয়েছিলেন। প্রান্তিক লোকদের নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের অনুরোধে থেকে গেলেন। মোর্তজাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। টঙ্গীতে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে গেলেন। কিন্তু তিনি তাঁর চিন্তার বাস্তবায়ন করার সুযোগ পেলেন না। বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।

ডা. মোর্তজা বলতেন, ‘একজন মানুষ ক্ষয় হয়ে যাবে; কিন্তু তার চিন্তার কোনো ক্ষয় নেই, চিন্তার কোনো মৃত্যু নেই।’

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান