default-image

ঢাকায় তখন উনসত্তরের আগুনরাঙা দিন। বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে এগিয়ে চলেছে চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতার দিকে। সেসব খবর সংগ্রহ করতে মোটরসাইকেলে ঢাকা শহর চষে বেড়ান সাংবাদিকেরা। কী হচ্ছে না হচ্ছে জানতে দেশের মানুষ তখন উদ্‌গ্রীব। খবরের কাগজে ফলাও করে ছাপা হচ্ছে তাদের সংগ্রহ করা সেসব খবর।

এভাবেই এসে গেল মুক্তিসংগ্রামের রক্তঝরা দিনগুলো। পাকিস্তানি হানাদার সৈনিকেরা গণহত্যা শুরু করলে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের গুরুত্ব যেমন বহুগুণ বেড়ে যায়, তেমনি তা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে ওঠে। কিন্তু সব বিপদ উপেক্ষা করে তখনকার মর্নিং নিউজ-এর দুই তরুণ রিপোর্টার ছোটাছুটি অব্যাহত রাখেন আগের মতোই। পেশাগত কাজের ফাঁকে তাঁদের একজন জড়িয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে, গোপনে নানা তথ্য দেওয়ার কাজে। একসময় পাকিস্তানি ঘাতক সেনাদের কোপানলে পড়লেন। তিনি শহীদ সাংবাদিক আবুল বাশার চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

অপরজন ছিলেন খ্যাতনামা সাংবাদিক গোলাম তাহাবুর। আবুল বাশারের স্মৃতিচারণা করে তিনি লিখেছেন, (স্মৃতি: ১৯৭১, রশীদ হায়দার সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ড) ‘একজন সজীব প্রাণচঞ্চল তরুণ জয়েন করল নতুন রিপোর্টার হিসেবে। কালো মোচ, কালো ফ্রেমের চশমা, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা—সবকিছু ছাপিয়ে ছিল সর্বদা হাসিখুশি ও তারুণ্যে ভরপুর অমায়িক ব্যবহার।...আমরা খুব কাছাকাছি এসে গেলাম। উনসত্তরের সেই গণ-আন্দোলনের রক্তমাখা দিনগুলোতে পেশাগত কাজের ব্যস্ততার মধ্যে যখন-তখন জোর করে ধরে নিয়ে খাইয়েছে। নতুন কেনা মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছে। সেদিনের পেশার অন্য বন্ধুরা, বিশেষ করে সিনিয়ররা আমাদের নাম দিয়েছিলেন মানিকজোড়।’

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে আবুল বাশার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাহাবুর এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘বুঝতাম বাশার অফিসের কাজ ছাড়াও অন্য কিছুতে খুব ব্যস্ত—মাঝে মাঝে খুব বেশি অস্থির। আমাকে অনেক সময় বলত শহরের কোনখানে কখন মুক্তবাহিনীর হামলা হবে।’

আবুল বাশারের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। শৈশব কেটেছে করাচিতে। লাহোরে তিনি সাংবাদিতা বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন। ঢাকায় থাকতেন মগবাজারে। একাত্তরের অক্টোবরের এক রাতে বাসা থেকে আবুল বাশারকে তুলে নেওয়া হয়। তার খোঁজ নিতে মর্নিং নিউজ-এর পক্ষ থেকে সেনানিবাসে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এমনকি রাও ফরমান আলীর সঙ্গেও যোগাযোগ করে খোঁজ জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই জানা যায়নি। তাহাবুর লিখেছেন, ‘বাশারের আব্বা ও আম্মা রোজ সকালে টাঙ্গাইল থেকে আসতেন আমার বাসায় এবং সারা দিন পর হতাশ মনে ফিরে যেতেন।...’ শেষ পর্যন্ত বাশারের খবর পাওয়া যায়নি।


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান

বিজ্ঞাপন