default-image

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সবেমাত্র জীবনের একটি স্থিতিশীল ধাপে পা রেখেছিলেন প্রভাষক সরোজকুমার নাথ অধিকারী। আর তখনই পাকিস্তানি নরপশু সৈনিকেরা নির্মমভাবে হত্যা করে তাঁকে।

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের মূলপাড়া গ্রামের দরিদ্র তাঁতি পরিবারে সরোজকুমারের জন্ম ১৯৩৮ সালে। বাবা রায়মোহন নাথ অধিকারী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাঁকে বাবার সঙ্গে তাঁত বোনার কাজে অংশ নিতে হতো। অভাব-অনটনের কারণে ছোট ভাই বিরাজ অধিকারী পড়ালেখা ছেড়ে পুরোপুরি তাঁত বোনার কাজে নিয়োজিত হলেও সরোজ পড়ালেখা ছাড়েননি। একটা সময় তিনি বাবুরহাটের কাপড়ের আড়তে এক মহাজনের গদিতে হিসাব লেখার কাজ নেন। সেখান থেকে পাওয়া টাকায় পড়ালেখার খরচ চালিয়েছেন।

সরোজকুমার ১৯৫৪ সালে গয়েসপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর দুই বছর বিরতি। নরসিংদী মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে পরের বছর গয়েসপুর উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। একই সঙ্গে জগন্নাথ মহাবিদ্যালয়ের নৈশ শাখায় স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। দিনে শিক্ষক, রাতে ছাত্র—এভাবেই ১৯৬০ সালে তিনি বাণিজ্য শাখা থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পরের বছর নরসিংদীতে ফিরে গিয়ে নরসিংদী মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেন। একই বছর বিয়ে করেন।

বিজ্ঞাপন

সরোজকুমার নরসিংদী মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার প্রস্তুতি নেন, পাশাপাশি স্ত্রীকেও স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ১৯৭০ সালে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রীও স্নাতক ও বিএড ডিগ্রি নেন। প্রশ্নোত্তরে বাণিজ্যিক আইন নামে স্নাতক শ্রেণির বাণিজ্য ও আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য সরোজকুমারের লেখা একটি পাঠ্যবই প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।

সরোজকুমার ভালো ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। মাঝেমধ্যে নাটকেও অভিনয় করতেন। বামধারার রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হলেও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেননি। তাঁর বন্ধু সরকার আবুল কালাম স্মৃতিচারণায় এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন। এটি প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি: ১৯৭১-এর পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ডে। এ ছাড়া আগামী প্রকাশনীর শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থেও সরোজকুমার সম্পর্কে তথ্য রয়েছে।

এসব সূত্র থেকে জানা যায়, একাত্তরের ১৮ আগস্ট একদল পাকিস্তানি সেনা নরসিংদী কলেজ থেকে শিক্ষক সরোজকুমার অধিকারী, রাধা গোবিন্দ সাহা, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মণীন্দ্র চন্দ্র দে, পরিমল চন্দ্র দে ও দারোয়ান নাসিরকে আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আরও অনেককে ধরে আনা হয়। ঘাতকেরা রাতে তাঁদের পাঁচদোনার লোহার পুলের কাছে লাইন করে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সরোজকুমারের স্ত্রী হাসি প্রভা দেবী নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তিনি অবসরের পর ২০০০ সালে মারা যান। তাঁর ছেলে অজয় অধিকারী আইনজীবী। নরসিংদী বারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর সপরিবার লন্ডনে চলে গেছেন।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান

বিজ্ঞাপন