default-image

সৈয়দপুর রেলওয়ের ওয়ার্কশপের প্রকৌশলী ছিলেন ফজলুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দপুর শহরের প্রায় ৮০ ভাগ বাসিন্দাই ছিলেন অবাঙালি। শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফজলুর রহমানকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কেন পালাবেন, কোনো অপরাধ তো তিনি করেননি। থেকে গেলেন অবাঙালি পরিবেষ্টিত রেল কলোনির আবাসনে। পরিণামে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হলো তাঁকে। স্ত্রী আর তিন ছেলেসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাঁকে।

সৈয়দপুর এখন নীলফামারী জেলাভুক্ত হলেও তখন ছিল রংপুর জেলার একটি থানা। মূলত রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করেই শহরটি গড়ে ওঠে। প্রকৌশলী ফজলুর রহমান থাকতেন রেল কলোনির একটি দোতলা বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী গৃহিণী হলেও স্থানীয় একটি মহিলা সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষকের কাজ করতেন। তাঁদের দুই মেয়ে ও চার ছেলে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধকালে বড় মেয়ে দিলরুবা খাতুন ঢাকার ইডেন কলেজে স্নাতকে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রংপুর কারমাইকেল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। মেজ ছেলে হাসিনুর রহমান, সেজ ছেলে আজিজুর রহমান ও ছোট ছেলে সাইদুর রহমান স্কুলে পড়তেন। ছোট মেয়ে ক্যামেলিয়া রহমানের বয়স তখন বছর তিনেক।

একাত্তরের ১৫ এপ্রিল ছিল পয়লা বৈশাখ। অনেক দিন পর সেদিন বাড়িতে গরুর মাংস, ডালের বড়াসহ একটু ভালো রান্না করেছিলেন ফজলুর রহমানের স্ত্রী। কিন্তু সে খাবার আর মুখে ওঠেনি কারও। সারা বাড়ি ভেসে গেছে রক্তের স্রোতে। পরিবারের আট সদস্যের মধ্যে পাঁচজনকেই ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা লিখেছেন ফজলুর রহমানের ছোট ছেলে সাইদুর রহমান। রশীদ হায়দার সম্পাদিত বাংলা একাডেমির স্মৃতি: ১৯৭১ বইয়ের পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ডে এই মর্মস্পর্শী লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পয়লা বৈশাখের দিন বেলা ১১টার দিকে একদল উন্মত্ত অবাঙালি হামলা চালান ফজলুর রহমানের বাসায়। তাঁরা বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। ফজলুর রহমান দরজা আগলে ছিলেন। প্রথমেই তাঁর পেটে বারবার ছুরি চালানো হয়, তখনই মারা যান তিনি।

সাইদুর রহমান লিখেছেন, মেজ ভাই হিরণ বাবার এই অবস্থা দেখে ‘আব্বা’ বলে চিৎকার করে খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে পড়লে ওরা ভাইজানের পিঠেও ছুরিকাঘাত করলে সেও মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। এরপরের বিবরণ লোমহর্ষক। ছেলেকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে মাকে হামলাকারীরা বারবার ছুরিকাঘাত করেন। একপর্যায়ে তাঁকে বাইরে এনে অর্ধমৃত অবস্থায় গর্তে ফেলে মাটি চাপা দেন। বড় ও সেজ ছেলেকেও খাটের তলা থেকে টেনে এনে বহুবার ছুরিকাঘাত করেন। ছোট মেয়ে ক্যামেলিয়াকে আছড়ে ফেলে দেন। ক্যামেলিয়া ও সাইদুর অবশ্য বেঁচে যান। বড় মেয়ে বাড়িতে না থাকায় তিনিও রক্ষা পান।

গ্রন্থনা: আশীষ–উর–রহমান

বিজ্ঞাপন