শহীদ বুদ্ধিজীবী, কবি ও নাট্যকার, ময়মনসিংহ

বিজ্ঞাপন
default-image

সকালে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলেন তারুণ্যে টগবগে কবি ও নাট্যকার প্রিয় সাধন সরকার। পেশায় তিনি শিক্ষক। দেড় বছরের ছেলে কোলে করে স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে। বাবাকে সাইকেলে উঠতে দেখে ছেলেটা কেন যেন খুব কান্না শুরু করল। হয়তো তার নিষ্পাপ অন্তর অনুভব করেছিল বাবার সঙ্গে এই তার শেষ দেখা। প্রিয় সাধন সাইকেল থেকে নামলেন। ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করে বললেন, ‘সোনামণি, তুমি তোমার মায়ের কাছে থাকো।’ তারপর চলে গেলেন প্যাডেল চেপে।

প্রিয় সাধন সরকারের স্ত্রী মঞ্জুলা সরকার প্রথম আলোর কাছে স্মৃতিচারণা করে কথাগুলো বলছিলেন। তিনি বললেন, ‘সেদিন ছিল একাত্তরের ১৯ জুলাই। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একটি গোপন সভা করতে গিয়েছিলেন। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ওই দিনই খবর এল, তাঁরা ছয়জন পাকিস্তানি সেনার হাতে ধরা পড়েছেন। সবাই হিন্দু। পরদিন থেকেই শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। আমরা এক কাপড়ে পালিয়ে পাশের গ্রামের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। খবর পাই, রাজাকাররা হানাদার সেনাদের নিয়ে আমাদের গ্রামে এসে বাড়ি বাড়ি আগুন দিয়ে লুটপাট করেছে। গ্রামের ছয়জন নারী আর দুজন বৃদ্ধকে গুলি করে মেরেছে। তারপর আমরা পালাতে শুরু করি। একটা সময় হালুয়াঘাট সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যাই। আমাদের ঠাঁই হয় শরণার্থী ক্যাম্পে।’

শহীদ শিক্ষক প্রিয় সাধন সরকারের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার পয়ারী গ্রামে। বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালে। প্রিয় সাধন শৈশব থেকেই কবিতা ও নাটক লিখতেন। নিজের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করতেন, অভিনয়ও করতেন। আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বিএড প্রশিক্ষণ নেন। গ্রামের পয়ারী গোকুল চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। রক্তাক্ত পলাশ নামে একটি কাব্য ও অস্তরাগ নামে একটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর। ভাবদর্পণ নামে একটি দর্শনবিষয়ক সাময়িকীও প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর সম্পাদনায়।

মঞ্জুলা সরকার জানালেন, তাঁদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। অর্থ ও নানাভাবে সাহায্য করা হতো। কিন্তু একটা সময় গ্রামে রাজাকার-আলবদরদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাদের আসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রিয় সাধন গোপনে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন। এমনই এক গোপন সভায় গিয়েছিলেন তিনি। পরে পরিবার জানতে পারে, ফুলপুরের কংস নদের তীরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বামীকে নিয়ে তাঁর একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমির রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি: ১৯৭১–এর পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ডে।

প্রিয় সাধন সরকারের সেই দেড় বছরের ছেলে তাপস সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাবার কোনো স্মৃতি তাঁর মনে নেই। তাঁরা দুই ভাই–বোন। ছোট বোন কাকলি সরকারের বয়স তখন ছিল মাত্র দুই মাস। কাকলি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। স্বাধীনতার পরে মা স্কুলে চাকরি নেন। অনেক সংগ্রাম করে তিনি তাঁদের বড় করে তুলেছেন। মা এখন অবসরে, ঢাকায় তাঁর কাছেই থাকেন।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান।

বিজ্ঞাপন