default-image

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা জ্ঞানার্জন ও বিতরণের সাধনাকেই জীবনের পরম উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করেন। শহীদ প্রফুল্লকুমার বিশ্বাস ছিলেন তেমনই একজন। পুলিশের উচ্চপদে চাকরি পেয়েও তা গ্রহণ করেননি। চেয়েছিলেন শিক্ষক হতে। জীবনের শুরু থেকে এটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ছাত্রদের মানবতার দীক্ষায় ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলায় পাকিস্তানি হানাদার সেনা, রাজাকার ও অবাঙালিরা মিলে গলা কেটে হত্যা করেছিল তাঁকে।

প্রফুল্লকুমার বিশ্বাসের জন্ম খুলনা জেলার রংপুর গ্রামে। বাবা ফৌজদার বিশ্বাস শিক্ষানুরাগী মানুষ ছিলেন। প্রফুল্লকুমার খুলনার দৌলতপুর মুহসিন উচ্চবিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৩৫ সালে দৌলতপুর হিন্দু একাডেমি (এখন বি এল কলেজ) থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৩৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেন। এরপর তিনি ১৯৪৬ সালে কলকাতার ডেবিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি ডিগ্রি নেন। এ ছাড়া তিনি কলকাতা থেকেই শরীরচর্চাবিষয়ক ‘বুকানন ট্রেনিং’ করেন।

যশোরের মশিয়ারহাটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন প্রফুল্লকুমার বিশ্বাস। এরপর খুলনার আড়ায়া উদয়ন বিদ্যাপীঠ এবং সর্বশেষ তাঁর নিজ গ্রাম রংপুরের কালীবাটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। প্রফুল্লকুমার বিশ্বাস সম্পর্কে এসব তথ্য রয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন প্রফুল্লকুমার। ১৯৪৯ সালে তিনি তৎকালীন ‘পূর্ববঙ্গ তপশীল জাতি ফেডারেশন’-এর কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৩ টানা ১০ বছর রংপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রফুল্লকুমার বিশ্বাস তাঁর উন্নত নৈতিকতা ও সদাচারের জন্য স্থানীয় সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। কালীবাটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় দফা আদায়ের জন্য অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে প্রফুল্লকুমারও তাতে সমর্থন দেন। ছাত্রদের তিনি স্বাধিকারের জন্য সচেতন করে তোলেন। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা গণহত্যা শুরু করলে তিনি তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। হানাদারদের ভয়ে সবাই প্রাণ রক্ষায় পালিয়ে গেলেও প্রফুল্লকুমার নিজের গ্রাম ত্যাগ করেননি। তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল, সবাই তাঁকে ভালোবাসে, কেউ তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু এটি ছিল তাঁর জীবনের বড় ভুল।

সেদিন ছিল বাংলা ১৩৭৮ সনের পয়লা বৈশাখ। একদল রাজাকার-আলবদর আর অবাঙলি পাকিস্তানি হানাদার ঘাতক সেনাদের নিয়ে এসে বাড়ি থেকে আটক করে প্রফুল্লকুমার বিশ্বাসকে। নিয়ে যায় বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের ধারে। সেখানে তারা নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করে এই নির্লোভ মানুষ গড়ার কারিগরকে।


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান