default-image

টাঙ্গাইলের কাগমারী মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের বাংলার প্রভাষক ছিলেন নিত্যানন্দ পাল। পাশাপাশি কলেজের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বও পালন করতেন। সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম অনুরাগ। নিয়মিত গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ লিখতেন। 
অমায়িক, মিষ্টভাষী নিত্যানন্দ পাল শিক্ষার্থীদের প্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাতৃভূমি ছেড়ে যাননি। নিজ বাড়িতেই ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি এলাকাবাসীকে বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হবেই। তবে আমরা হয়তো সেদিন থাকব না।’ কথাটা অক্ষরে অক্ষরে তাঁর ক্ষেত্রেই ফলে যায়।

একাত্তরের ২০ জুলাই, মঙ্গলবার, রাত ১১টায় রাজাকাররা নিত্যানন্দ পালের ঘরের দরজায় গিয়ে আঘাত করে। তাদের কয়েকজনের মুখ ছিল কালো কাপড়ে আবৃত। স্ত্রীর চিৎকারে বাড়ির সবাই রাজাকারদের কাছে তাঁর জীবন ভিক্ষা চায়। তখন তারা সবাইকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। রাজাকাররা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, টাঙ্গাইল জেলা সদরের পানির ট্যাংকের নিচের বধ্যভূমিতে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনার বিবরণ জানা যায় তাঁর ছোট ভাই পরিতোষ পালের আমার ভাই রচনা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘এখনো মনশ্চক্ষুতে ভেসে ওঠে সেই কালরাত্রির ভয়ঙ্কর লগ্নের দৃশ্য। ১৯৭১ সালের ২০ জুলাই মঙ্গলবারের রাত্রি। সমস্ত গ্রামের বুকের ওপরে পাষাণচাপা ভয়। সন্ধ্যার পর পথঘাট নির্জন, গৃহগুলো দীপহীন। এই ভৌতিক পরিবেশে রাত ১১টায় বড় পাকা সড়ক থেকে বেশ কয়েকজন রাজাকার ঢুকে পড়লো গ্রামের মধ্যে। এদের মাঝে কয়েকজনের মুখ ছিল কাপড়ে আবৃত। বাড়ির প্রবেশমুখেই ছিল একটি ঘর। ছায়াঢাকা পরিবেশে এই ঘরটি ছিল দাদার প্রিয়। তাই এই ঘরেই তিনি থাকতেন। আমরা সবাই নিদ্রাহীন ভয়ে পড়ে আছি বাড়ির অন্য ঘরে। সহসা দাদার ঘরের সামনে কর্কশ কণ্ঠের হুঙ্কার—‘দরজা খোল’। ... একটু পরেই বৌদি ছুটে এসে চিৎকার করে পড়ে গেলেন আমাদের ঘরের বারান্দায়। ইতোমধ্যে আমরা দরজা খুলে বাইরে আসার চেষ্টা করছি। কিন্তু কয়েকজন রাজাকার বন্দুক ধরে আমাদের নিষেধ করলো ঘরের বাইরে বেরুতে। এর মধ্যে দাদাকে নিয়ে চলে গেছে একদল রাজাকার। সেদিন রাত ১০টায় শুতে যাবার আগে সেই যে দাদাকে দেখেছিলাম তারপর আর দেখি নি। পরে জেনেছি, টাঙ্গাইল জেলা সদরের জলের ট্যাংকের নিচে যে বধ্যভূমি ছিল, সেখানেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল নির্মমভাবে।...স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়েই তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন, নাম “কবরের কান্না”। মনে হয় কবিতাটি পরিমার্জিত করার সময় পান নি তিনি। কয়েকটি ছত্র তুলে দিচ্ছি-“কবরের কান্না” থেকে: “হতভাগ্য শহীদের রক্তাক্ত দেহটাকে মাটি চাপা দিয়ে/ সেদিনের ঘাতকের দল সৃষ্টি করেছিলো যে ইতিহাস;/ বন্য-উল্লাস অথবা জল্লাদ বৃত্তির সে ইতিহাসকে ঘিরে/ শহীদ-সমাধি আজও শতাব্দীকে করে উপহাস।”’ (স্মৃতি: ১৯৭১, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশ ১৯৮৯, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

নিত্যানন্দ পালের জন্ম ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুয়ারি, টাঙ্গাইল জেলা শহরের কাছে সন্তোষ ইউনিয়নের কাগমারী গ্রামে। বাবা ক্ষিতীশ চন্দ্র পাল, মা সুশীলা সুন্দরী পাল। বাবা-মায়ের বড় ছেলে। ১৯৫৩ সালে সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে ১৯৫৭ সালে আইএ ও ১৯৬১ সালে বিএ পাস করেন। এরপর আবার তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। এমএ পাস করেন ১৯৬৭ সালে। বিএ পাস করার পর স্থানীয় মগড়া হাইস্কুলে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন।

পড়াশোনার প্রতি তাঁর নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায় এমএ পরীক্ষা দেওয়ার পর। প্রথমবারের ফল ভালো না হওয়ায় দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে আশানুরূপ ফল করেন।
নিত্যানন্দ পাল দুই কন্যাসন্তান বনানী ও স্বপ্নার জনক। স্ত্রী সন্ধ্যা রানী পাল। ১৯৭৩ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের পাঠাগারের নাম ‘শহীদ নিত্যানন্দ পাঠাগার’ করা হয়েছে।

স্কেচ: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (ষষ্ঠ পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৭) থেকে।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান