default-image

কিশোরগঞ্জ কলেজের শিক্ষক ছিলেন তিমির কান্তি দেব। বিনয়ী, বিনম্র ও অধ্যবসায়ী ছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীদেরও প্রিয় ছিলেন।

তিমির কান্তি দেব বিশ্বাস করতেন, তাঁর কোনো শত্রু নেই। এই বিশ্বাসই তাঁকে একাত্তরে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে তিনি তা সরল মনে বিশ্বাস করেছিলেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ এই সময় তাঁকে কাজে যোগ দিতে বলে। আত্মীয়স্বজন ও আপনজনদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তিনি সেপ্টেম্বরে কলেজে যোগ দেন।

৬ ডিসেম্বর অন্যান্য দিনের মতো তিনি কলেজে যান। বেলা ১১টার দিকে কলেজ সেক্রেটারি তাঁকে ডেকে পাঠায়। কলেজ সেক্রেটারি ছিল স্বাধীনতাবিরোধী। সরলতার কারণেই স্বাধীনতাবিরোধী সেক্রেটারির ডাক তিনি উপেক্ষা করেননি। সেই যে তিনি কলেজ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, আর ফেরেননি। এরপর কোথাও তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনা এবং তাঁর সম্পর্কে জানা যায় নিবেদিতা দাস পুরকায়স্থের ‘আমার আপনজন’ রচনা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘না আজো পায়নি কেউ তাঁর সন্ধান। স্বাধীনতার বিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে তাঁর নাম। ছুটি পেলে ফিরব বলে যিনি গেলেন, শত ছুটি শেষেও এলেন না ফিরে আর। অনেকটা বিস্মৃত একটি নাম অধ্যাপক তিমির কান্তি দেব। অথচ তাঁর জীবন গড়ে উঠেছিল শৃঙ্খলাবোধ, ন্যায়বোধ ও পরিমিতবোধের মহিমায়। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল আদর্শ শিক্ষক হওয়ার। অশিক্ষা কুশিক্ষার গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে বাঁচাতে চেয়েছেন দেশের তরুণ সমাজকে। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে তরুণ সমাজের আত্মশক্তিকে জাগাতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন জ্ঞানের সত্যকে চিরন্তনতার মূল্যে দেখতে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত কলেজের হাজিরা খাতায় রয়েছে তাঁর হাজিরার স্বাক্ষর।

‘স্বাধীনতার পর আত্মীয়স্বজন তাঁর খোঁজ করতে গেলে কেউ কেউ বলেছেন—৬ ডিসেম্বর সকালে তিনি যথারীতি কলেজে এসেছেন। হাজিরা খাতায় সই দিয়েছেন। বেলা এগারটার দিকে তাঁকে কলেজ সেক্রেটারী ডেকে পাঠান। সহজ সরল মনে সেক্রেটারীকে বিশ্বাস করে তার সাথে দেখা করার জন্যে কলেজ ছেড়ে বের হন। আর ফেরেননি। শোনা যায় কলেজ সেক্রেটারী নিজে ছিলেন রাজাকার বাহিনীর সদস্য। তিনিই তিমির কান্তিকে তুলে দেন পাকসেনাদের হাতে। তাঁর পরিণতি সম্বন্ধে কেউ জানে না। স্বাধীনতার পর মুক্তিবাহিনী হত্যা করেছে কলেজ সেক্রেটারীকে।...

‘তার মা এখনো অপেক্ষা করে আছেন ছেলে তার ফিরবে। তিমিরের অন্তর্ধানের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিমিরের পরিবারের সদস্যদের মনে সঞ্চারিত হয়েছে ভীতি। সে কারণে তিমির সম্বন্ধে তারা সহজেই কিছু বলতে চান না। শহীদ পরিবার হিসেবে তারা এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো স্বীকৃতি পাননি। একটি স্বাধীন দেশে সত্যিকার শহীদের মর্যাদা এই সব শহীদ বুদ্ধিজীবী কবে পাবেন কে জানে? কেনইবা তারা সব সময় ভীত সন্ত্রস্ত থাকবেন?’ (স্মৃতি: ১৯৭১, পঞ্চম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৯২, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

তিমির কান্তি দেবের জন্ম ১৯৪৬ সালের ৫ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর থানার একামধু গ্রামের শিক্ষক পরিবারে। বাবা ত্রিশীথ কুমার দেব, মা লীলাবতী দেব। দশ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর স্কুল ও কলেজ-জীবনের কিছু অংশ কাটে মৌলভীবাজারে। ১৯৬৫ সালে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। এরপর যোগ দেন কিশোরগঞ্জ কলেজে।

তিমির কান্তি দেব ছিলেন বিবাহিত।

প্রতিকৃতি: শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট (সপ্তম পর্যায়) প্রকাশ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা (১৯৯৮) থেকে।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
[email protected]

বিজ্ঞাপন