default-image

গুলি করে হত্যা করেও জিঘাংসা মেটেনি বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের। শহীদ ড. ফজলুর রহমান খানের মৃতদেহের বুক বেয়নেট দিয়ে চিরে ক্রস চিহ্ন দিয়ে দেয় তারা।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে যে গণহত্যা শুরু করেছিল হানাদাররা, সেই নির্মমতার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ফজলুর রহমান খান। তিনি তখন ছিলেন মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। নীলক্ষেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় শিক্ষকদের আবাসনে থাকতেন, সেখানেই শহীদ হন। তাঁর স্ত্রী ফরিদা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তিনি তখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন বলে প্রাণে রক্ষা পান।

ফজলুর রহমানের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২ মার্চ নেত্রকোনার কাজিয়াটি গ্রামে। জন্মের মাত্র ১৮ মাস পরেই তিনি মাকে হারান। তাঁর বাবা আবদুল হেকিম খান ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৫৪ সালে ফজলুর রহমান মোহনগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে মাধ্যমিক পাস করে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পরের বছরই মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে পিএইচডি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলে, তিনি জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

বিজ্ঞাপন

ফজলুর রহমান খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় থেকেই প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত হন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদার মনের মানুষ ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন ক্রমেই দানা বেঁধে উঠলে তিনিও তাতে যুক্ত হন।

স্ত্রী লন্ডনে থাকায় ভাগনে আলী আহসান খান কাঞ্চন নীলক্ষেতের আবাসনে তাঁর সঙ্গেই থাকত। ঘাতক বাহিনী ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১০ মিনিটে বাসায় হামলা চালায়। তারা প্রথমে কাঞ্চনকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর ফজলুর রহমান খানকে গুলি করে। হত্যা করার পর ঘাতকেরা তাঁর বুকে বেয়নেট দিয়ে চিরে ক্রস চিহ্ন এঁকে দেয়। গৃহকর্মী জবানের পায়ে গুলি লাগলেও তিনি বাথরুমে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

শহীদ ফজলুর রহমানের ভাই আবদুল হান্নান ঠাকুর এসব বর্ণনা দিয়েছেন আমার ভাই নামের লেখায়। এটি প্রকাশিত হয়েছে স্মৃতি: ১৯৭১ বইতে (সম্পাদনা রশীদ হায়দার, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)। তিনি লিখেছেন, ‘২৭শে মার্চ যখন কারফিউ কিছু সময়ের জন্য উঠিয়ে নেওয়া হলো, তখন সংবাদ পেয়ে ভাই ও কাঞ্চনকে আনতে যাওয়া হয়। সে মর্মান্তিক দৃশ্য বর্ণনা করা সাধ্যাতীত। ঘরে ও বারান্দায় রক্ত, শুধু রক্ত। জমাট বাঁধা কালো রক্ত। দরজার পাশেই পড়ে আছ কাঞ্চনের লাশ। স্টিলের আলমারির গা ঘেঁষে ভাইয়ের একটি অনড় হাত পড়ে আছে আলমারির ওপর।...আজিমপুর কবরস্থানে ছোট ভাই ও কাঞ্চনকে কফিনে পুরে তাড়াহুড়ো করে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়। আর সেখান থেকে আমরা ঘরে না ফিরে হায়েনার ভয়ে সবাই পালিয়ে যাই অজানার পথে।’


গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান