default-image

তখনও আঁধার পুরোপুরি কাটেনি। ভোরের আবছা আলোয় মিশে আছে ফজরের আজানের সুর। ছেলেটা জেগে উঠে কান্নাকাটি শুরু করেছে। রাতে ভালো করে ঘুমায়নি, কেবল কেঁদেছে। আ ন ম গোলাম মোস্তফা ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কান্না থামানোর জন্য একটু হাঁটাহাঁটি করছিলেন চত্বরে।

এ সময় একদল সৈনিক এসে কড়া নাড়ল দরজায়। তুলে নিয়ে গেল সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে। মুক্তিযুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা বিভোর ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে কী করবেন, সে কল্পনায়। কিন্তু স্বাধীন দেশের সূর্যোদয় দেখা হলো না তাঁর।

বিজ্ঞাপন

সেদিন ছিল একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর। গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ঝর্ণা জাহাঙ্গীর সেদিনের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, সামরিক পোশাকে অস্ত্র হাতে ১২-১৩ জন বাসার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। মোস্তফার বাবা তখন নামাজের জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন। দুজন সৈনিক ভেতরে এসে জিজ্ঞেস করে এটা মোস্তফার বাড়ি কি না। ছেলে অভীকে কোলে করে মোস্তফা এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন। সৈনিকেরা তাঁকে বলে, ‘কাইন্ডলি আমাদের সঙ্গে একটু আসুন। বাচ্চাকে রেখে আসুন। ভয়ের কিছু নেই, আমরা আপনাকে পূর্বদেশ পত্রিকা অফিসে নিয়ে যাব। ওখানে আপনার আইডেন্টিটি কার্ডটা একটু পরীক্ষা করব।’ (স্মৃতি: ১৯৭১, রশীদ হায়দার সম্পাদিত, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)।’

গোলাম মোস্তফার মনে সেই মুহূর্তে কোনো ভয় ছিল না। ছেলেকে রেখে তিনি চলে যান ঘাতক সৈনিকদের সঙ্গে। ভোর হলে তাঁর ছোট ভাই পূর্বদেশ অফিসে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, মোস্তফা অফিসে আসেননি। কারা কোথায় তাঁকে নিয়ে গেছে, অফিসের কেউ কিছু জানেও না।

গোলাম মোস্তফার জন্ম নীলফামারী জেলায় ১৯৪১ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছিলেন, কাজ করতেন দৈনিক সংবাদ–এর বার্তা বিভাগে। পরে দৈনিক আজাদ–এ এবং শেষে জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন দৈনিক পূর্বদেশ–এ। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা করতেন। অন্তরঙ্গ নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনা করতেন।

গোলাম মোস্তফাকে যখন ঘাতকেরা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, তখন তাঁর ছেলের বয়স ছিল এক বছরের কম। আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। পরের সন্তান মেয়ে, সে তার বাবার মুখ দেখতে পায়নি। দুই সন্তান নিয়ে কঠিন সংগ্রামের জীবন গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ঝর্ণা জাহাঙ্গীরের। আক্ষেপ করে লিখেছেন, দেশ স্বাধীন হলো, অনেক মুক্তিযোদ্ধা ফিরে এলেন ঘর আলো করে। কিন্তু মোস্তফার আত্মীয়স্বজন তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশটাও খুঁজে পেলেন না। চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন মানুষটা।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান।

বিজ্ঞাপন