default-image

একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে খ্যাত ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র বিশ্বাস। গোপালগঞ্জ ও খুলনার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। এর পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারের জন্য কাজ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং জনকল্যাণকর কাজের জন্য এসব এলাকার লোকজনের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গ্রামবাসী এখনো তাঁকে ভোলেননি। তাঁর মৃত্যুদিবসে শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

শহীদ গোবিন্দচন্দ্র বিশ্বাসের জন্ম ১৯০১ সালে (বাংলা ১৩০৮ সনের ৮ ভাদ্র), গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাতপাড় ইউনিয়নের সাতপাড়া দক্ষিণপাড়ার ঠাকুরবাড়িতে। বাবা বনমালী বিশ্বাস ও মা তারা দেবী বিশ্বাস। ভাইবোনের মধ্যে গোবিন্দ চন্দ্র ছিলেন বড়। তাঁদের পরিবারটি শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিত ছিল। গোবিন্দচন্দ্র ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জ এসএম মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (বর্তমানে এসএসসি) ও ১৯২২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৪ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

বিজ্ঞাপন

লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ভালো সাঁতারু ছিলেন। ছাত্রজীবনে এলাকার বিভিন্ন সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। খুলনার তেরখাদা উপজেলার সাচিয়াদাহ উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন গোবিন্দচন্দ্র। পরে নিজ এলাকার লোকজনের অনুরোধে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী সাহাপুর সম্মিলনী উচ্চবিদ্যালয়ে যোগ দেন। বিদ্যালয়টি ভালো অবস্থানে দাঁড় করিয়ে তিনি যোগ দেন টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতি ডুমুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে। এরপর তিনি সাতপাড়া এলাকার কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সাতপাড় দীননাথ গয়ালী চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একাত্তরে গোপালগঞ্জে গণহত্যা শুরু করলে মে মাসে বৃদ্ধা মা তারা দেবী বিশ্বাসকে নিয়ে তিনি মকসুদপুর উপজেলার বহুগ্রাম ইউনিয়নের বনবাড়ি গ্রামে মেয়ের বাড়িতে চলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। হানাদার পাকিস্তানি সেনারা ১৯ মে বনবাড়ি গ্রামে হামলা চালায়। তারা একের পর এক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। চলতে থাকে লুটপাট ও নির্যাতন। লোকজন প্রাণভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে পালাতে থাকে।

গোবিন্দচন্দ্র তাঁর মাকে নিয়ে পাশের একটি ধানখেতে লুকিয়ে ছিলেন। ঘাতকেরা তাঁদের দেখে ফেলে। বৃদ্ধা মাকে জড়িয়ে ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র। মায়ের কোল থেকে ছেলেকে টেনে নিয়ে মায়ের সামনেই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করছিল। মায়ের চোখের সামনে ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করল ঘাতক সেনারা। সেদিন ধানখেতে অনেকের মৃতদেহ পড়ে ছিল। এভাবেই শেষ হয়ে গেল শিক্ষানুরাগী গোবিন্দচন্দ্রের জীবন। পরে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। গোবিন্দচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে।

গত সপ্তাহে সাতপাড় দক্ষিণপাড়ায় গোবিন্দচন্দ্র বিশ্বাসের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর একমাত্র ছেলে মনোজ বিশ্বাসের স্ত্রী আলোমতির (৭১) সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মনোজও শিক্ষকতা করতেন, ২০১৭ সালে মারা গেছেন। তাঁর দুই সন্তান বিদেশে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর এই এলাকার শিক্ষার জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি বাচ্চাদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করতেন। নিজের কথা কখনো ভাবেননি। অন্যের বিপদে পাশে থেকেছেন।’ তিনি জানান, এলাকাবাসী তাঁর শ্বশুরের কথা ভোলেননি। প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিবস ৩ জ্যৈষ্ঠে সাতাপাড় ও সাহাপুর ইউনিয়নের লোকজন এই বাড়িতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য হাতের লেখা, রচনা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।

গ্রন্থনা: নুতন শেখ, প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ

বিজ্ঞাপন