default-image

পাকিস্তানি হানাদার সেনারা নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিল আইনজীবী শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জিকে। দিনাজপুরের জেলখানা থেকে বের করে সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এমনকি মৃতদেহের সৎকার পর্যন্ত করতে দেয়নি তারা।

আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনীতিক শিবেন্দ্রনাথ ছিলেন চিরকুমার। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংযোগ স্কুলজীবন থেকে। তাঁর জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ শহরে ১৯২৫ সালে। পরিবার নিয়ে তাঁর চিকিৎসক বাবা রংপুরে এসে স্থায়ী হন। রংপুর শহরেই তাঁর বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন শুরু। রংপুরে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পরে কলকাতা থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ও আইনে ডিগ্রি নেন।

স্কুলজীবনেই শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জি ব্রিটিশবিরোধী অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত ক্ষুদিরাম বসুর সান্নিধ্যে এসেছিলেন। রংপুর জিলা স্কুল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকায় দুই বছর কারাভোগ করেন। সেই থেকে বামধারার রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যুক্ততা ছিল বরাবর। একসময় কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষণা করলে তাঁকেও কারাবন্দী করা হয়। পরে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। রংপুরে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালে শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায় পাকিস্তানি সরকার। ১৯৫৮ সালেও তিনি গ্রেপ্তার হন আইয়ুবের সামরিক শাসনের সময়। কারারুদ্ধ হয়েছেন ১৯৬৫ সালে। বারবার জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন সত্ত্বেও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে ছয় দফাকে কেন্দ্র করে গণ-আন্দোলন শুরু হলে রংপুরে শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জিও এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে অংশ নেন। রংপুরে নিয়মিত সভা-সমাবেশ-মিছিল করতে থাকেন।

শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জি অনেক আগে থেকেই পাকিস্তানি হানাদারদের নজরে ছিলেন। তারা এখানে গণহত্যা শুরু করার পর একাত্তরের ৩০ মার্চ রংপুরের গুপ্তপাড়া থেকে তাঁকে তুলে সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায়। শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জি সম্পর্কে ‘আমার আপনজন’ নামে একটি লেখায় বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন তাঁর অনুজপ্রতিম ম. জিল্লুর রহমান। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘শিবেনদার ওপর নরপশুদের অত্যাচারের মাত্রা এত নিদারুণ ও পাশবিক ছিল যে দাদাকে যখন কোর্টে উপস্থিত করা হয়, তখন তাঁকে দুজন পুলিশ কাঁধে করে দাঁড়িয়ে থাকেন।’

শিবেন্দ্রনাথকে ৭ নভেম্বর রংপুর কারাগার থেকে দিনাজপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। যাত্রাকালে রংপুর রেলস্টেশনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা শুভানুধ্যায়ীদের বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন রংপুর থেকে এটাই তাঁর শেষ যাত্রা। রংপুর ও দেশবাসীকে তিনি শুভেচ্ছা দিয়েছিলেন। দিনাজপুর কারাগার থেকে ১১ নভেম্বর শিবেন্দ্রনাথ মুখার্জিকে সেনানিবাসে তুলে নিয়ে যায় ঘাতক সেনারা। আরও অনেকের সঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান