default-image

শিক্ষক কাজী আবদুল জব্বার ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলেন তিনি। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর আত্মদানের ঘটনা স্মরণে রেখেছে এলাকার মানুষ। শহরের একটি প্রধান সড়কের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে।

শহীদ কাজী আবদুল জব্বারের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা প্রথম আলোকে জানান নওগাঁর সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা-আল-মেহমুদ রাসেল। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে তিনি এই শহীদের তথ্য পাঠিয়েছেন। নওগাঁর মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, এ বিষয়ে রক্তঋণ ১৯৭১: নওগাঁ নামে তাঁর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যসূত্র ধরে প্রথম আলো এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে মার্চেই কাজী আবদুল জব্বার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি নওগাঁর বিভিন্ন স্থানে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সর্বশেষ যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ভারত সীমান্তঘেঁষা নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুণ এলাকা। বিজয়ের উষালগ্নে ৬ ডিসেম্বর যুদ্ধের একপর্যায়ে হানাদারদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে শহীদ হন তিনি। সহযোদ্ধারা পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে সেখানেই দাফন করেন।

শহীদ জব্বারের তিন ছেলে। বড় ছেলে কাজী ছাইদুল হালিম ফিনল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। মেজ ছেলে চিকিৎসক কাজী শফিকুল হালিম জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) অধ্যাপক। ছোট ছেলে কাজী শাহেদুল হালিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

কাজী শাহেদুল হালিম প্রথম আলোকে জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ১০ মাস। মা ও অন্যদের কাছে বাবার কথা শুনেছেন। তাঁর বাবার জন্ম ১৯৪২ সালের ১০ জুন অবিভক্ত বাংলার দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। দাদার নাম কাজী তাজের মোহাম্মদ আর দাদি কাজী আমেনা বেগম। দেশ বিভাগের পর সপরিবার তাঁরা নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুরে বসবাস শুরু করেন।

আবদুল জব্বার নওগাঁর বিএমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে নওগাঁয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬৩ সালে নজিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

মার্চের উত্তাল সময়ে কাজী আবদুল জব্বার এলাকায় মিছিল–সমাবেশ করে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও তরুণদের সংগঠিত করেন। হানাদাররা গণহত্যা শুরু করলে মার্চেই তিনি তাঁর বেশ কয়েকজন বন্ধু ও ছাত্রকে নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতের বালুরঘাটে চলে যান। পরে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় স্ত্রী ও তিন ছেলেকে ভারতের দাড়ালহাট এলাকায় পাঠিয়ে দেন।

ছোট ছেলে কাজী শাহেদুল বলেন, ‘হানাদাররা নজিপুরে আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ভারতেই ছিলাম। ডিসেম্বরে বাবা ও তাঁর সহযোদ্ধারা আগ্রাদ্বিগুণ এলাকায় যুদ্ধ করছিলেন। হানাদারদের ক্যাম্পে অভিযান চালানোর সময় তিনি শহীদ হন।’

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জব্বারের স্মৃতি রক্ষার্থে নজিপুর পৌরসভার পুরাতন বাজার থেকে চকনিরখিন মোড় পর্যন্ত একটি প্রধান সড়ক তাঁর নামে নামকরণ হয়েছে এবং স্মৃতিফলকও নির্মাণ করা হয়েছে।

গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, নওগাঁ।