default-image

সজ্জন ও নিপাট এক ভদ্র মানুষ ছিলেন নওগাঁর শিক্ষক ওসমান আলী মোল্লা। ভালো শিক্ষক হিসেবে এলাকায় তাঁর সুনাম ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এলাকায় তাঁর বেশ ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানি হানাদাররা গণহত্যা শুরু করলে এলাকার তরুণ ও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের ২২ এপ্রিল স্কুল থেকে সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছেন ওসমান আলী। এমন সময় একদল পাকিস্তানি সেনা তাঁদের গ্রামে আক্রমণ করে। ঘাতকের দল গ্রামের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে শিক্ষক ওসমান আলী মোল্লাসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আটজনকে ধরে তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে। নদীর তীরে পাঁচ দিন ধরে মৃতদেহগুলো পড়ে ছিল। খুনি সেনা ও রাজাকারদের ভয়ে কেউ সেখানে যেতে পারেনি। পরে প্রবল বর্ষণে লাশগুলো নদীতে ভেসে যায়।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে শহীদ ওসমান আলী মোল্লা সম্পর্কে তথ্য পাঠান নওগাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁর সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা-আল-মেহমুদ। নওগাঁর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণার ভিত্তিতে তাঁর রক্তঋণ ১৯৭১: নওগাঁ বইতে শহীদ ওসমান আলীর জীবনী রয়েছে। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করা হয়।

শহীদ ওসমান আলী মোল্লা ১৯২৬ সালে নওগাঁ সদর উপজেলার চকরামপুর মোল্লাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা অসির আলী মোল্লা ও মা আলিমোন বিবি। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। ওসমান আলী ১৯৪২ সালে হাট-নওগাঁ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চকরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি দোগাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। শহীদ হওয়ার সময় তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি আর ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেনি। বাবার এমন নির্মম মৃত্যুর শোকে বড় ছেলে বজলুর রহমান মানসিক রোগী হয়ে যান। আর সুস্থ হননি। মেজ ছেলে রুস্তম আলী অটোরিকশাচালক এবং ছোট ছেলে আবদুর রাজ্জাক সাবেক সেনাসদস্য।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরে শহীদ ওসমান আলীর ছোট ছেলে আবদুর রাজ্জাকের বয়স ছিল মাত্র এক বছর। পরে মা ও স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছেন বাবার হত্যার কাহিনি। রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কথা বলতেন। এলাকার তরুণ ও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এ জন্য পাকিস্তানিদের দোসর অবাঙালি ও রাজাকাররা বাবাকে হুমকিও দিয়েছিল। কিন্তু বাবা তারপরও তাঁর নীতি থেকে সরেননি। একাত্তরের ২২ এপ্রিল বিকেলে বাবা সবে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। এ সময় পাকিস্তানি সেনারা আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে। বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে বাবাসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষদের নিয়ে তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই দিন বাবাসহ আটজন শহীদ হয়েছিলেন।’

ওসমান আলীর মেয়ের জামাই আবদুর রহমান বলেন, তাঁর শ্বশুর ও অন্যদের নদীর পাশে যে জায়গায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তার পাশেই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। ফলে কেউ ভয়ে লাশগুলো এনে দাফন করার সাহস পায়নি। হত্যা করার পাঁচ দিন পর্যন্ত লাশগুলো নদীর তীরেই পড়ে থাকতে দেখেছে এলাকার লোকজন। পরে প্রবল বর্ষণে লাশগুলো নদীর পানিতে ভেসে যায়।

শহীদ ওসমান আলীর ছাত্র বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মার্চের উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে নওগাঁ শহরে মিছিল-মিটিং করতেন ওসমান স্যার। শহর ও আশপাশে ঘুরে ঘুরে তিনি জনমত তৈরি করতেন। পাকিস্তানিরা গণহত্যা শুরু করলে স্যারের উৎসাহে আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু ভারতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে যাই। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে জানতে পারি হানাদার সেনারা স্যারকে হত্যা করেছে।’

শহীদ ওসমান আলী মোল্লাকে মনে রেখেছেন এলাকার মানুষ। তাঁর স্মরণে নওগাঁ পৌরসভার চকরামপুর-বাইপাস সড়কের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ ওসমান আলী সড়ক’। তবে তাঁর নাম শহীদ বুদ্ধিজীবীর সরকারি তালিকাভুক্ত হয়নি। ওসমান আলীর নাম সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাসহ তাঁর সঙ্গে একাত্তরের ২২ এপ্রিল শহীদ আটজনের স্মৃতিতে চকরামপুর এলাকায় একটি স্মৃতিফলক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শহীদদের স্বজনেরা।

গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, নওগাঁ