default-image

সেকেন্দার হায়াত চৌধুরী পেশায় যন্ত্রপ্রকৌশলী হলেও ভালো ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতেন। আবার গান গাইতেন, আবৃত্তি, বিতর্ক করতেন। স্কুল-কলেজে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে তিনি থাকতেন মধ্যমণি হয়ে। বাড়িতে ছোট বোনদের গান-আবৃত্তি শেখাতেন। বাগান করতেও পছন্দ করতেন। যেমন প্রাণবন্ত, তেমনি সুদর্শন ছিলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা মানুষটি।

সেকেন্দার হায়াত যন্ত্রপ্রকৌশলী হিসেবে ১৯৭০ সালে রেলওয়েতে যোগ দেন। প্রথম কর্মস্থল ছিল ঢাকার কমলাপুরে। মুক্তিযুদ্ধের কিছু আগে তাঁর বদলি হয়েছিল সৈয়দপুর কারখানায়। সেখানে তাঁর যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না, তবু যেতে হয়েছে।

তাঁর জন্ম ১৯৪৪ সালে। গ্রামের বাড়ি ফেনী। শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহে। মেধাবী ছাত্র ছিলেন, স্কুল থেকেই ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা ছিল তাঁর। প্রথমে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সেকেন্দার হায়াতের বোন বীণা চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ময়মনসিংহে বিমানবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের কোহাটে। কিন্তু প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে তিনি একটা সময় লক্ষ করলেন, তাঁকে বিমানবাহিনীর প্রকৌশলীর বদলে সাধারণ সৈনিকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের এমন বৈষম্যে আগে থেকেই তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর প্রতি পাকিস্তানিদের এই আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেননি। প্রশিক্ষণ শেষ না করে বাড়ি ফিরে আসেন। পরে তিনি রেলওয়েতে যোগ দেন।

বিজ্ঞাপন

সেকেন্দার হায়াত যখন সৈয়দপুরে যান, তখন দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছিল। অবাঙালি প্রধান সৈয়দপুরের অবস্থা আরও খারাপ। বীণা চৌধুরী লিখেছেন, ‘প্রায় ঘন ঘন চিঠি লিখতেন। চিঠিতে বাবাকে লিখেছিলেন, “বাবা, দেশে গোলযোগ শুরু হয়েছে, তোমরা সাবধানে থেকো।” সেই চিঠি আজও আছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমাদের সঙ্গে দাদার আর যোগাযোগ হয়নি। বাবা ভেবেছিলেন হয়তো চলে আসবে কিন্তু আসেনি। (স্মৃতি: ১৯৭১, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেকেন্দার হায়াত বাড়ি ফিরে না গিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে ভারতে চলে যান। সেখানে প্রশিক্ষণ নেন। সহকর্মীদের অনেকে ভারতে থেকে গেলেও প্রশিক্ষণ নিয়ে বীর সেকেন্দার হায়াত প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিতে আবার দেশে ফিরে আসেন। সেকেন্দার হায়াত কোথায় কীভাবে শহীদ হয়েছেন, তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। দেশের জন্য এমন অনেক মানুষই আত্মদান করে গেছেন, যাঁদের কথা পরে আর নির্দিষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। শহীদ সেকেন্দার হায়াত চৌধুরী তেমনই একজন, তাঁর আত্মদান মিশে আছে লাল-সবুজ পতাকায়, জাতীয় সংগীতে, এ দেশের সার্বভৌমত্বে।

গ্রন্থনা: আশীষ-উর-রহমান।