default-image

একাত্তরের ১৪ জুন সকাল আটটা। নাশতা করে বন্দুক নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন স্কুলশিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক। লাইসেন্স করা পারিবারিক বন্দুকটি থানায় জমা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। স্ত্রীকে বললেন দুপুরে ফিরে ভাত খাবেন। কিন্তু তিনি আর ফিরলেন না। বাড়ির সামনের সড়ক থেকে থানার পুলিশ ও রাজাকাররা তাঁকে ধরে তুলে দেয় পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের কাছে।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নাদিরা বেগম প্রথম আলোর কাছে স্মৃতিচারণা করছিলেন। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে এখনো বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে তাঁর কণ্ঠ। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গবেষক সেলিম রেজা আবু বকর সম্পর্কে তথ্য ও ছবি পাঠান। সেই সূত্রে অনুসন্ধান করা হয়।

শহীদ আবু বকর সিদ্দিকের জন্ম ১৯৩৫ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর পজেলার বাগোয়ান গ্রামের এক অবস্থাসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা কিফাত উল্লাহ মালিথা, মা আনোয়ারা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি পঞ্চম। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন ফিজিক্যাল এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিজ গ্রামের বাগোয়ান কেসিভিএন হাইস্কুলে। একজন সমাজসচেতন, দায়িত্বশীল ও সাহসী শিক্ষক হিসেবে এলাকায় তাঁর সুনাম ছিল।

বিজ্ঞাপন

আবু বকর সিদ্দিক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দৌলতপুরে প্রচারণা চালানোর জন্য সাংগঠনিক ভূমিকা রাখেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রথম থেকেই তিনি স্থানীয় ছাত্র ও যুবকদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। একাত্তরের মে মাসে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার শিকারপুর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাকশন ক্যাম্পে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। দেশে ফিরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা শুরু করেন।

জুনের মাঝামাঝি বাড়িতে এলে রাজাকাররা তাঁর পারিবারিক বন্দুকটি দৌলতপুর থানায় জমা দিতে চাপ দিতে থাকে। ঘটনার দিন তিনি বন্দুকটি নিয়ে বের হলে রাজাকাররা তাঁকে ধরে সীমান্তবর্তী প্রগপুর সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নির্মম নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শহীদ আবু বকরের বড় ছেলে আবু তাহের পারিবারিক বিষয়াদির দেখভাল করেন, ছোট ছেলে এম এ নাসের আয়কর আইনজীবী। দুই মেয়ে গৃহবধূ।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবু বকরের অনুপ্রেরণায় আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। তিনি এলাকায় যুদ্ধের সময় ব্যাপক কাজ করেছিলেন। তাঁকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে চিঠিসহ দুই হাজার টাকার অনুদান দেন। অধ্যাপক মেজর (অব.) বজলুল করীমের কুষ্টিয়ার দৌলতপুরকে যেমন দেখেছি গ্রন্থে শহীদ আবু বকর সিদ্দিকের সচিত্র জীবনী রয়েছে। ২০১৪ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘দেশটাকে ভালোবেসে’ অনুষ্ঠানে শহীদ আবু বকর সিদ্দিকের সাক্ষাৎকার প্রচার করেন।

গ্রন্থনা: তৌহিদী হাসান, কুষ্টিয়া

বিজ্ঞাপন