default-image

বন্যার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছয়-সাত মাস স্থল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের সঙ্গে। নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় ছিল না। পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ছোট যমুনা নদী। মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গন থেকে প্রতি রাতে নৌকায় করে এসে ওই গ্রামে আশ্রয় নিতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র উপস্থিতিতে উদ্দীপ্ত হতেন গ্রামবাসী। আইনজীবী আবু ফারুক চৌধুরীর নেতৃত্বে গ্রামের মুক্তিকামী মানুষ চাঁদা তুলে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতেন।

একপর্যায়ে স্থানীয় রাজকাররা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে গ্রামটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের আসা-যাওয়ার খবর দেয়। একাত্তরের ১৪ অক্টোবর ভোররাতে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে ঘাতক সেনারা। গোলাগুলির শব্দ ও আর্তচিৎকারে ঘুমন্ত গ্রামবাসী জেগে ওঠে। তালিকা ধরে ধরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে বর্বরের দল। তাদের এই গণহত্যায় আইনজীবী আবু ফারুক চৌধুরী ও তাঁর বড় ভাই শামসুল হক চৌধুরীসহ ১১ জন শহীদ হন।

বিজ্ঞাপন

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে নওগাঁর স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা-আল-মেহমুদ শহীদ আবু ফারুক চৌধুরীর ছবি ও তথ্য পাঠান। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তরুণ এই গবেষকের মাঠপর্যায়ের গবেষণাগ্রন্থ রক্তঋণ: ১৯৭১-এ আবু ফারুক চৌধুরীর তথ্য রয়েছে।

আবু ফারুক চৌধুরীর জন্ম ১৯৪২ সালে নওগাঁর বদলগাছির গয়েশপুর গ্রামে। বাবা ওয়ারেছ আলী চৌধুরী, মা শরিফুন্নেছা চৌধুরী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ১৯৫৬ সালে বগুড়া মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬০ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে পরের বছর থেকে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি ১৯৭১-এর পুনর্বিন্যাসকৃত চতুর্থ খণ্ডে ফারুক চৌধুরীসহ গয়েশপুরের গণহত্যার বিবরণ রয়েছে তাঁর মামাতো ভাই খসরু চৌধুরীর লেখায়। তিনি উল্লেখ করেছেন, আবু ফারুক চৌধুরী সক্রিয় রাজনীতি না করলেও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় টান ছিল তাঁর। প্রচুর পড়াশোনা করতেন। মাতৃভূমির প্রতি ছিল সুগভীর ভালোবাসা।

ফারুক চৌধুরীর মেজ ভাই ছয়ফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু ছোট ভাই ফারুক চৌধুরী ও বড় ভাই শামসুল হক চৌধুরী বাড়িতেই একটি কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। হানাদার সেনাদের সঙ্গে আসা স্থানীয় রাজাকার বাজু চৌধুরী ও তার ছেলে আলো চৌধুরী আমাদের বাড়ির বাইরে থেকে দরজা আটকে দেয়। তারা ঘাতক সেনাদের নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ফারুক চৌধুরীকে খুঁজতে শুরু করে। এ সময় বড় ভাই শামসুল হক চৌধুরীর মেয়ে সামসাদ বেগম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পাক সেনারা তাকে গুলি করে। তার আর্তনাদ শুনে দুই ভাই ঘর থেকে বাইরে বের হলে ঘাতক সেনারা দুজনকে সেখানেই গুলি করে হত্যা করে।’

স্বাধীনতার পর নওগাঁ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে শহীদ আবু ফারুক চৌধুরীর নামে একটি মিলনায়তন করা হয়। এ ছাড়া গয়েশপুর থিয়েটার হলের সামনে আবু ফারুক চৌধুরীসহ ১১ শহীদের নামে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।

গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, নওগাঁ

বিজ্ঞাপন