default-image

বাংলাদেশের ইতিহাসে মেহেরপুরের ভবের পাড়ার বৈদ্যনাথ বাবুর আমবাগান স্মরণীয় হয়ে আছে একাত্তরের ১৭ এপ্রিল প্রথম সরকার গঠিত হওয়ার কারণে। এর পরদিনই পাকিস্তানি হানাদার সেনারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মেহেরপুরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা চালায়।

শহরের প্রবেশমুখে আমঝুপি কৃষিফার্মের কাছে মুক্তিবাহিনীর একটি দল হানাদারদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু হানাদার সেনারা সংখ্যায় বেশি ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত থাকায় মুক্তিবাহিনী সরে যায়। রাজাকারদের নিয়ে পাকিস্তানি ঘাতক সেনারা মেহেরপুরে শুরু করে বর্বর তাণ্ডব। এই গণহত্যার প্রথম শিকার হন মেহেরপুর সদরের চাঁদবিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার। পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি ঘেরাও করে তাঁকে তুলে নিয়ে পাশের একটি বাগানে গুলি করে হত্যা করে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে মেহেরপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমিন আবদুস সাত্তারের ছবি ও তথ্য পাঠান। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করা হয়।

বিজ্ঞাপন

শহীদ আবদুস সাত্তার ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ। নাটক, পালাগান রচনা ও অভিনয় করতেন গ্রামে গ্রামে। পাকিস্তানিদের জুলুম–নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহ জাগাতেন। বাড়িতে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালে ভারতের নদীয়া জেলার তেহট্ট থানার রাধানগর গ্রামে। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তাঁর পরিবার মেহেরপুর জেলার আমঝুপি গ্রামে বসতি স্থাপন করে। বাবা জিন্দার আলি, মা খুকি বেগম। তাঁদের আট সন্তানের মধ্যে আবদুস সাত্তার কনিষ্ঠ। তিনি নদীয়া জেলার দারিয়াপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং মেহেরপুর কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। প্রায় ২০ বছর বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর আবদুস সাত্তার ও চিকিৎসক মহিউদ্দিন আহমেদ আমঝুপি ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটি গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় তরুণদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন গেরিলা বাহিনী। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত কাজী সাজ্জাদ আলী জহিরের মুক্তিসংগ্রামে মেহেরপুর, আগামী প্রকাশনীর রফিকুর রশীদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: মেহেরপুর জেলা এবং মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের স্মরণিকা জয়যাত্রায় (১৭ এপ্রিল ২০১৯) আবদুল্লাহ আল আমিনের লেখা নিবন্ধে আবদুস সাত্তারকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে শহীদ সাত্তারের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি ও দুই হাজার টাকার অনুদান পাঠিয়েছিলেন। এ ছাড়া মেহেরপুরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে জেলা পরিষদের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত এই স্তম্ভের নামফলকে আবদুস সাত্তারের নাম উৎকীর্ণ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শহীদ সাত্তারের স্ত্রী বেগম হাসনা বানু এবং তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে আবু সাঈদ মারা গেছেন। বড় ছেলে ও মেয়ে বেঁচে আছেন। বড় ছেলে আবু আবিদ স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব হিউম্যান রাইটসের (এসপিএইচআর) নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। আমাদের কাছে এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই।’

গ্রন্থনা: আবু সাঈদ, মেহেরপুর