default-image

অভিনয় ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। শৈশব থেকেই শুরু হয়েছিল অভিনয়চর্চা। স্বপ্ন ছিল অনেক বড় অভিনেতা হবেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন। অদম্য ইচ্ছা, মেধা আর নিষ্ঠায় স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মো. আবদুল বারী মিঞা। কিন্তু স্বপ্নের দরজায় যখন শুরু হয়েছে তাঁর কড়া নাড়া, ঠিক তখনই পৃথিবী থেকে নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই তরুণ প্রতিভাকে।

আবদুল বারী মিঞার জন্ম ১৯৪০ সালে টাঙ্গাইল জেলার নারুচী গ্রামে। বাবার নাম আবদুল জব্বার মিঞা। পড়াশোনায় তেমন একটা মনোযোগী ছিলেন না বারী মিঞা। ঝোঁক ছিল অভিনয়ের প্রতি। স্কুলের বার্ষিক নাটকে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন। অভিনয় করেছেন বহু নাটক ও যাত্রাপালায়।

পরে নিজ উদ্যোগে অনেক নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। মাধ্যমিক পাস করার পর পড়ালেখার দিকে অগ্রসর না হয়ে অভিনয়কেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন বারী মিঞা। টাঙ্গাইল ও আশপাশের এলাকায় তাঁর অভিনয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

অভিনয় ছাড়া এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনিই ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা।

বারী মিঞার কর্মজীবন শুরু হয় টেলিফোন অপারেটর হিসেবে। ১৯৬২ সালে তিনি যোগ দেন খুলনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। খুলনায় গিয়েও তিনি সেখানকার নাট্যসংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় চালিয়ে যান।

বিজ্ঞাপন

আরও বড় পরিসরে, বৃহৎ দর্শকের সামনের নিজের সৃজনশীলতা তুলে ধরতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল ঢাকায় এসে মঞ্চে ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন। খুলনায় বছর পাঁচেক কাজ করার পর ১৯৬৭ সালে ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। শহীদ বারী মিয়া সম্পর্কে এসব তথ্য রয়েছে বাংলা একাডেমির শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে। তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি।

বারী মিঞা তাঁর স্বপ্নপূরণ করতে যখন ঢাকায় এলেন, তখন বদলে যেতে শুরু করেছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দেশের মানুষ উদ্দীপ্ত স্বাধিকারের চেতনায়। ক্রমেই স্বাধীনতার জন্য জেগে উঠছিল মুক্তিপাগল বাঙালি। আবদুল বারী মিঞা শুধু অভিনয় নিয়েই বুঁদ হয়ে ছিলেন না, এই আন্দোলনের উত্তাপ লেগেছিল তাঁর বুকেও।

এক দিকে বড় অভিনেতা হওয়ার আজন্মলালিত স্বপ্ন, অন্য দিকে দেশের স্বাধীনতার ডাক। উভয় দিকেই সমান আবেগ ও উদ্যমে এগিয়ে যান বারী মিঞা। ছদ্মবেশী নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিছু কিছু কাজও চলছিল। ওদিকে আবার সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন অসহযোগ আন্দোলনে। এতে হানাদারদের কুনজরে পড়েছিলেন তিনি।

সেদিন ছিল একাত্তরের ৩ মে। আবদুল বারী মিঞা কর্মস্থলে এলে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী তাঁকে আটক করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। মাঝপথেই শেষ হয়ে যায় এক তরুণের স্বপ্ন।

গ্রন্থনা: আশীষ–উর–রহমান।