default-image

আবদুর রহমান ছিলেন লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালের সহকারী চিকিৎসক। বাসা হাসপাতাল চত্বরেই। দিনটা ছিল একাত্তরের ৪ এপ্রিল, বেলা ১১টা। বাসায় এসে স্ত্রীর কাছে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি চাইলেন। আর তখনই পাকিস্তানি ঘাতক সেনারা এসে হানা দেয় তাঁর বাড়িতে। পানিও খেতে পারলেন না। আবদুর রহমান ও তাঁর দুই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করল নরপিশাচেরা।

শহীদ চিকিৎসক আবদুর রহমানের গ্রামের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছার কাশিমপুর গ্রামে। তিনি চাকরির সুবাদে লালমনিরহাটে আসেন ১৯৬২ সালে। মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই ছিলেন। তাঁর স্ত্রী হামিদা খাতুনের বয়স এখন ৯০-এর কাছাকাছি। মেয়ে আখতার জাহানের সঙ্গে থাকেন ঢাকায়। আখতার জাহান ২০১১ সালে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের বার্তা নিয়ন্ত্রক পদ থেকে অবসরে যান। আরেক মেয়ে মমতাজ জাহান সেরিকালচার বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। থাকেন রাজশাহীতে। বড় ছেলে মাহবুবার রহমান ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী শামসুন্নাহার লালমনিরহাট শহরের গার্ডপাড়ায় থাকেন। আরেক ছেলে লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক লতিফুর রহমান ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর মারা গেছেন।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতিচারণা করে শহীদ আবদুর রহমানের মেয়ে আখতার জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বাসাটি ছিল দোতলা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলাম। আমার বড় ভাই মাহবুবার রহমান লাভলু থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি বাড়িতে থাকতেন না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা লাভলু ভাইকে খুঁজতে আসত। তাঁকে না পেয়ে আমার বাবাকে বাসা থেকে বাইরে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। আমার ছোট ভাই আখাউড়া কলেজের বিএসসির ছাত্র হাবিবুর রহমান জগলু ছুটে গিয়ে হানাদার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করলে ওরা তাকেও গুলি করে হত্যা করে। আমার আরেক ভাই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হামিদুর রহমান বাবলু বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। অবাঙালিরা তাঁকে ধরে ঘাতক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। সেদিন ঘাতকেরা আরও অনেককে হত্যা করেছিল। পরে তাঁদের সবাইকে আমাদের বাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ওই জায়গা এখন রেলওয়ে গণকবর বলে পরিচিত।’

লালমনিরহাট রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় রেলওয়ে বিভাগ শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে। সেখানে উৎকীর্ণ রয়েছে শহীদ চিকিৎসক আবদুর রহমানের নাম। বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগ থেকে স্বাধীনতাসংগ্রামে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান নিয়ে একাত্তরের উত্তাপ নামের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। এতে ‘তোমরা মৃত্যুঞ্জয়ী-৭১’ শীর্ষক রেলের ৮৩ জন শহীদের নামের তালিকার প্রথম নামটিই চিকিৎসক আবদুর রহমানের।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ লালমনিরহাট জেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার (সাবেক) মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন তালিকায় ৪ নম্বরে রয়েছে শহীদ আবদুর রহমানের নাম।

গ্রন্থনা: আবদুর রব, প্রতিনিধি, লালমনিরহাট

বিজ্ঞাপন