default-image

বহুমাত্রিক প্রতিভা ছিল শহীদ অনিল চন্দ্র মল্লিকের। যেমন ছিল সাহস, তেমনি দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। শৈশব থেকেই ভাস্কর্যচর্চা ও অভিনয় করতেন। যাত্রাপালায় তাঁর অভিনয় খুব প্রশংসিত হয়েছিল। মৃৎশিল্প সৃজনে তিনি ছিলেন সুদক্ষ। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ভালো খেলোয়াড়ও ছিলেন। মূলত মঞ্চে অভিনয় আর ভাস্কর্য নিয়েই মেতে থাকতেন এই তরুণ শিল্পী।

অনিল চন্দ্র মল্লিক ১৯৪৯ সালে মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার নবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জগবন্ধু মল্লিক। চার ভাই, দুই
বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। নবগ্রাম ইউনিয়নের শশীকর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি।

একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে অনিল তাঁর গ্রামের কয়েকজন সাহসী তরুণকে নিয়ে একটি দল তৈরি করেন। উন্নত কোনো অস্ত্র ছিল না। বর্শা, সড়কি, রামদা, তির-ধনুক, ঢাল-তলোয়ারের মতো দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই তিনি প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁদের আগ্রহ দেখে আনোয়ার নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা নবগ্রাম স্কুলমাঠে অস্ত্র চালানো ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের ১৪ মে চার সদস্যের হানাদার বাহিনীর একটি দল নবগ্রাম এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল তিনটি রাইফেল আর একটি চায়নিজ সাব-মেশিনগান। তারা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিল আর সামনে পড়া লোকদের গুলি করছিল। এ সময় মানুষ দল বেঁধে পালাতে থাকে। অনিল তখন গ্রামবাসীদের পালাতে নিষেধ করেন। তাঁর কথায় শত শত গ্রামবাসী যার হাতে যা ছিল, তা-ই নিয়ে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে এগিয়ে যান হানাদারদের দিকে।

তখন সকাল ১০টার মতো। অনিলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দোনারকান্দি নামের একটি জায়গায় ঘিরে ফেলেন হানাদার সেনাদের। যুদ্ধ হয়েছিল তুমুল। একপর্যায়ে অনিল জাপটে ধরেন এক পাকিস্তানি সেনাকে। অন্যরাও দল বেঁধে এসে ঘাতক সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ঘাতক সেনারা পালাতে চেষ্টা করলে খালের পানিতে পড়ে গিয়ে তিন সেনার মৃত্যু হয়।

ঘাতক সেনাকে জাপটে ধরার সময় গুলিতে গুরুতর আহত হন অনিল। অনেক রক্তপাত হচ্ছিল তাঁর। যুদ্ধজয়ী গ্রামবাসী তখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে অনিলকে নৌকায় করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। নবগ্রামের চিকিৎসক সুরেন সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বিকেল চারটার দিকে অনিল মারা যান। অনিল চন্দ্র মল্লিকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি রয়েছে বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে।

অনিল চন্দ্র মল্লিকের বড় ভাই অতুল মল্লিক বেঁচে আছেন। গ্রামের বাড়ি নবগ্রামেই থাকেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, অনিল ও তাঁর সহযোদ্ধারা যেসব অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তার কয়েকটি স্থান পেয়েছে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। কিছু অস্ত্র এখনো গ্রামের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে। অনিলের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংবর্ধনা দিয়েছে। কিন্তু তাঁর অসাধারণ বীরত্বের জন্য কোনো খেতাব বা রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়নি। ১৯৯৪ সালে গ্রামবাসী অনিলের স্মরণে দোনারকান্দি বাজারে নির্মাণ করেছেন একটি স্মৃতিসৌধ।

গ্রন্থনা: অজয় কুন্ডু, মাদারীপুর